Wednesday, April 28, 2021

ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্কের মৌলিক শর্ত বনাম প্রচলিত সামাজিক খোঁয়াড় Marital Relation in Islam

 

ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্কের মৌলিক শর্ত বনাম প্রচলিত সামাজিক খোঁয়াড়

আমাদের সমাজে পারিবারিক পরিমণ্ডলে স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসার ছড়াছড়ি খুব একটা চোখে পড়ে না। অথচ বিয়ের পেছনে ইসলামের যেসব মহান উদ্দেশ্য আছে, তার মধ্যে এটিও একটি। ইসলাম চায়, স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসার সাবলীল বহিঃপ্রকাশ ঘটুক। কিন্তু, আমাদের সমাজে আমরা কি এ ধরণের কোন পরিবেশ অনুভব করি? ভালোবাসার কোন সুগন্ধ কি পরিবারগুলোর দরজা জানালার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে? আসে না। আসে না কেন? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। যেগুলোর উল্লেখ করা হলে, বাণীর উৎসের প্রতি এই প্রথা নির্ভর সমাজের অলঙ্ঘ্য দুর্গ থেকে, প্রবল শব্দে উষ্মার কামান গর্জে উঠতে পারে। তবুও আমাদেরকে কথা বলতে হবে। থেমে গেলে চলবে না। আজ আমি কেবল সবচে বড়ো জুলুমটার কথাই বলবো।
আমাদের সমাজের সাধারণ প্রথা হলো, বিয়ের আলোচনার টেবিলে পাত্র ও পাত্রীর অংশগ্রহণ না থাকা। কবুল বলার অধিকারটুকুই তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে, আল্লাহ্‌ তায়ালার নির্দেশ ও রাসূলে কারীম (সা) এর শেখানো পদ্ধতির সরাসরি খেলাফ, এই কুপ্রথা, কবে কিভাবে চালু হলো, তা কারো জানা আছে কি না সন্দেহ। এখন পর্যন্ত এই কুপ্রথা চালু আছে। অথচ, অধিকাংশ মেইনস্ট্রীম আলেম এ ব্যাপারে এখনও নীরব।
দেখুন, বিয়ের প্রশ্নে আমরা নিজেদেরকে অনেকটা গবাদিপশুর শ্রেণীতে ফেলে দিয়েছি। এখানকার অবস্থা দেখে মনে হয়, সংসার হলো, সন্তান উৎপাদনকারী খামার আর বিবাহ হলো এর বায়না দলীল। আমাদের দেশের বিবাহের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে, সংসারকে খামারবাড়ি ছাড়া আর কি বিশেষণেই বা ভূষিত করা যেতে পারে? দুইটা বিপরীত লিংগের প্রাণীকে একটা ছাদের নীচে রেখে দাও। এরপর প্রোডাকশনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকো। ভাবখানা তো এমনই। কেউ এর বিপরীত বলতে পারবেন না। অথচ মানুষ তো গবাদিপশু নয় যে, দুই জায়গা থেকে যেমন তেমনভাবে ধরে এনে একটা জোড়া মিলায়ে দিলেই হলো।
অথচ, বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিই হলো ভালোবাসার উপস্থিতি। ইসলামে সুস্পষ্ট ভাষায় স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়েছেন, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা এবং শরীয়তের মালিক- আল্লাহ্‌ তায়ালা।
“এবং তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যেনো তোমরা তাদের কাছে মানসিক শান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন”। সূরা আর রূমঃ ২১।
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে একটি দেহ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য স্বয়ং সেই বস্তু থেকে তৈরি করেছেন একটি জোড়া, যেনো তোমরা তার কাছ থেকে শান্তি ও আরাম হাসিল করতে পারো”। সূরা আ’রাফঃ ১৮৯।
“তারা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা হচ্ছো তাদের জন্য পোশাক”। আল বাকারাঃ ১৮৭
সুবহানাল্লাহ! কি সুন্দর উপমা ব্যবহার করলেন আল্লাহ্‌ তায়ালা! স্বামী আর স্ত্রীর ভালোবাসা যে কতো পবিত্র এবং আকাঙ্ক্ষিত বিষয়, তা বুঝানোর জন্য এই একটি উপমাই যথেষ্ট।
একইভাবে, কুরআনে কোন বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা না রাখার যে তুলাদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তা হলো দু'টি মানুষের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্ক।
“তোমরা (স্বামী ও স্ত্রী) তোমাদের মাঝে উত্তম আচরণের ব্যাপারখানা ভুলে যেও না”। আল বাকারাঃ ২৩৭
“তোমরা (স্বামীরা) হয় তাদেরকে (স্ত্রীদেরকে) উত্তম পন্থায় রেখে দাও অথবা উত্তম পন্থায় বিদায় দাও। শুধু কষ্ট দেবার উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। এতে তাদের অধিকার (অন্য পুরুষকে স্বামী হিসেবে বেছে নেওয়া) খর্ব করা হয়। যে ব্যক্তিই এমনটা করবে, সে নিজের উপরই জুলুম করবে। আল বাকারাঃ ২৩১
অর্থাৎ, মনের সাবলীল ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন স্ত্রীকে কোন স্বামীর সাথে ঘর করতে বাধ্য করতে, আল্লাহ্‌ তায়ালা নিষেধ করেছেন। কারণ স্ত্রীও একজন মানুষ। তার ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম আছে। জোর করে কোন পুরুষ মানুষের সাথে ঘর করতে তাকে বাধ্য করা যাবে না।
“যদি তোমরা আপোষে মিলেমিশে থাকো এবং পরস্পর সীমালংঘন করার ব্যাপারে সতর্ক থাকো, তাহলে আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই ক্ষমাকারী ও দয়াময়। আর যদি (মিলেমিশে থাকা সম্ভব না হয়) দম্পতি পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ্‌ তায়ালা আপন অসীম অদৃশ্য ভাণ্ডার থেকে উভয়কে সন্তুষ্ট করবেন”। সূরা আন নিসাঃ ১২৯-১৩০।
অর্থাৎ, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মিল-মিশ ও ভালোবাসার এমন ঘাটতি দেখা দিলো যে, তারা বিয়ের যে সীমা আছে তা লংঘন করে ফেলার আশংকা সৃষ্টি হলো, যেমন, পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়া, ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া, একজন আরেকজনের অধিকারে হাত দিয়ে ফেলা, অথবা হত্যা বা আত্মহত্যায় প্ররোচিত হওয়া। এমন পরিস্থিতি কখনোই ইসলাম কামনা করে না। এই পরিস্থিতিগুলো বিয়ের যে উদ্দেশ্য ছিলো, একজন অন্যজনের কাছে শান্তি ও রহমের আশ্রয় পাওয়া, সেই উদ্দেশ্যকে লংঘন করছে। এখানে এরকম সীমালংঘনের আশংকা দেখা দিলে দাম্পত্য সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলতে বলা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আল্লাহ্‌র ভাষ্য মতে, এমনটা করলে, আল্লাহ্র অসস্তুষ্টিতে পড়ার আশংকা তো নেই-ই বরং, আল্লাহ্‌র অসীম অদৃশ্য ভাণ্ডার থেকে উভয়কে সন্তুষ্ট করার আশাও দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং, এ থেকেও আমরা বুঝলাম যে দাম্পত্য সম্পর্কের আসল স্তম্ভই হলো পারস্পরিক বোঝা পড়া ও ভালোবাসার উপস্থিতি। দু’টি বৈরি সম্পর্ককে নিছক সমাজের চাহিদা পূরণের জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখা শরিয়তের উদ্দেশ্য নয়।
দেখা সাক্ষাৎ এবং পরিচয় ছাড়াই এই সম্পর্ক তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। কুরআনের ভাষায়,
“এতে তোমাদের কোন গুনাহ নেই যে, এসব নারীদের বিবাহের প্রস্তাব সম্পর্কে ইংগিতে কোন কথা বলো অথবা নিজেদের অন্তরে তা গোপন রাখো। আল্লাহ্‌ জানেন যে, শিগগীর তোমরা তাদের ব্যাপারে আলোচনা করবে। কিন্তু, তাদেরকে গোপনে প্রতিশ্রুতি দিও না। হ্যাঁ, নিয়ম মাফিক (খোলামেলা) আলোচনা করতে পারো’। সূরা বাকারাঃ ২৩৫।
দেখা সাক্ষাতের ব্যাপারে রাসূলে কারীম (সা) নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট।
রাসূলে কারীম (সা) বলেছেন,
"(বিয়ে করতে চাইলে) প্রথমে তাকে দেখে নাও"। -তিরমিযী
আরেক জায়গায় বলেছেন,
"তুমি ভালো করে দেখো, তার (পাত্রীর) কোন বিষয়টা তাকে বিয়ে করার ব্যাপারে তোমাকে আগ্রহী করে"। - আবু দাউদ, মেশকাত
এছাড়াও, তিনি (সা) পাত্রকে পাত্রীর বৈধ অঙ্গগুলো দেখতে বলেছেন। - আবু দাউদ, মেশকাত
লক্ষ্য করুন, উপরের কুরআন ও হাদীসের এই কথাগুলো পাত্রের বাবা, মা, অভিভাবক কিংবা আত্মীয় স্বজনকে বলা হয়নি, বলা হয়েছে স্বয়ং পাত্রকে।
একইভাবে পাত্রীদেরকেও এই অধিকার দেওয়া হয়েছে।
“বালেগা বিবাহিতা নারীর অনুমতি ব্যতীত যেমন বিয়ে দেওয়া যাবে না, তেমনি বালেগা কুমারীকেও তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না। সাহাবাগণ (রা) জিজ্ঞেস করলেন, তার (কুমারী মেয়ের) অনুমতি কিভাবে নেওয়া যেতে পারে (যদি মেয়ে লজ্জায় কথা না বলে)? তিনি বলেন, তার চুপ থাকাই অনুমতি”। -সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
শুধু তাই নয়, আমরা অনেকেই মনে করি, স্বামীর পার্থিব যোগ্যতা, নীতি নৈতিকতা অথবা ধার্মিকতাই সব, পাত্রের চেহারা তথা তার দেহের গঠন ধর্তব্য নয়; ইসলাম কিন্তু তা বলে না।
সাবিত ইবনে কায়েস (রা) এর একজন স্ত্রী জামীলা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে নিচের ভাষায় বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলেনঃ
“হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা)! আমার মাথা ও তার মাথাকে কোন বস্তু কখনো একত্র করতে পারবে না। আমি (বিয়ের পর) ঘোমটা তুলে তাকাতেই দেখলাম, সে কতগুলো লোকের সাথে সামনে থেকে আসছে। (তার মানে বিয়ের আগে জামিলা (রা) সাবিত (রা) কে দেখেননি।) কিন্তু আমি ওকে ওদের সবার চেয়ে বেশী কালো, সবচেয়ে বেঁটে এবং সবচেয়ে কুৎসিত চেহারার দেখতে পেলাম। আল্লাহ্‌র শপথ! আমি তার দীনদারী ও চারিত্রিক কোন ত্রুটির কারণে তাকে অপসন্দ করছি, এমন না, বরং তার কুৎসিত চেহারাই আমার কাছে অসহনীয়”।
এই অভিযোগ শুনে নবীজী (সা) বললেনঃ “সে তোমাকে (মোহরানা হিসেবে) যে বাগানটি দিয়েছিলো, তুমি কি তা ফেরত দেবে?”
উত্তরে জামীলা (রা) বললেনঃ "হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা)! আমি তা ফেরত দিতে রাজি আছি, বরং সে যদি আরও বেশি কিছু চায়, তাও দিবো"।
নবী (সা) তখন তাকে শুধু বাগানটি দিতে বললেন, আর সাবিত (রা) কে বললেন, তিনি যেনো বাগানটি গ্রহণ করে জামীলা (রা) কে এক তালাক দেন।
-ইবনে জারীর।
প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র রুচিবোধ, পছন্দ অপছন্দ, জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি, স্বভাব প্রকৃতি, অভ্যাস ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ও ধারণার অধিকারী। এই বৈশিষ্ট্য ও ধারণার স্বাতন্ত্র্যবোধ তাকে আলাদা ব্যক্তিত্বে রূপ দেয়। এভাবেই এক একজন মানুষ অন্য আর এক জন ব্যক্তি থেকে ভিন্ন সত্ত্বা লাভ করে। এই বৈশিষ্ট্য তাকে সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সাবধানি করে তোলে, সে হয়ে উঠে নৈর্বাচনিক। সব ধরণের মানুষের সাথে তার সখ্য হয় না। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিরাই তার ঘনিষ্ঠ হতে পারে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে তার বন্ধু নির্বাচনে দক্ষ করে তোলে। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিত্বের সাথে তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে পড়ে।
“Birds of the same feathers flock together.”
বিবাহের মতো সুদূরপ্রসারী একটি সম্পর্ক করার আগে পাত্র ও পাত্রীর ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের এই দিকগুলো কি আমরা বিবেচনা করি? একজন পাত্র কেমন ধরণের নারীকে তার জীবন সংগীনি হিসেবে পেতে চান, তা কি আমরা মূল্যায়ন করি? যখন একজন লো কোয়ালিটির রমনীর সাথে হাই কোয়ালিটির কোন পুরুষকে জুড়ে দেওয়া হয় অথবা লো কোয়ালিটির পুরুষের সাথে হাই কোয়ালিটির তরুণীকে বেঁধে দেওয়া হয়, তখন তাদের উপর কতো বড় জুলুম করা হয়, তা কি আমরা উপলব্ধি করার কোশেশ করি! এই একটি জুলুম পরবর্তীতে ঐ পরিবারে কতো অসংখ্য জুলুমের সৃষ্টি করতে পারে, সে কথা কি আমরা ভেবে দেখি? আমৃত্যু এই অসম সম্পর্কে, খুনসুটি থেকে শুরু করে বড়ো ধরণের অঘটনও ঘটতে পারে। এসব অঘটন পরবর্তী প্রজন্মের উপর স্থায়ী রেখাপাত করে।
মহিলাদের ব্যাপারটা তো আরও হৃদয়বিদারক! একজন রমনী, বাবা-মাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য, স্বাভাবিক লজ্জাশীলতার কারণে অথবা পরিবারের শান্তি রক্ষার নিমিত্তে, পাত্রকে না দেখে শুনেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশে, অজানা মানুষদের ভীড়ে আসেন, সহায় শুধু স্বামীর দয়া ও সহানুভূতি। আবার, এই লোকটাকে বিয়ের আগে একবারের জন্যও তিনি দেখেননি, লোকটার দিকে তাকালে তার ভালো লাগবে না অন্তরে অনীহা সৃষ্টি হবে, এই বিষয়টাও পরিস্কার নয়, আবার দেখলেও তার ভালো লাগা মন্দ লাগার নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ যেখানে সন্দেহজনক বলে বিবেচ্য, তেমন পরিস্থিতিতে, এক বিপুল মানসিক দ্বান্দ্বিকতা আর অনিশ্চয়তা নিয়েই বাড়িঘর ও আপনজন ছেড়ে, সারা জীবনের তরে, নিশ্চিতভাবে ঐ লোকটার কাছে চলে যাওয়া, এটা কি সাধারণ মানের কোন ত্যাগ! এই ত্যাগ কি তারা স্বেচ্ছায় করেন? মনের আনন্দে করেন? না পরিবেশের চাপে পড়ে, বাধ্য হয়ে করেন? তারপর তার সাথে কি নোংরা, জঘন্য ও পৈশাচিক আচরণ করা হয়, প্রাসঙ্গিকতা রক্ষার খাতিরে সেসব প্রসঙ্গে নাই বা গেলাম।
এখানে অনেকেই হয়তো বলবেন যে, যারা দেখে, শুনে ও বুঝে সম্পর্ক করেন, তাদের কি কোন সমস্যাই হয় না। তাদের উত্তরে আমি বলবো, অবশ্যই হতে পারে বরং না হওয়াটাই তো অস্বাভাবিক। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের মিথষ্ক্রিয়ার দাবীই হলো, তাদের মধ্যে মতের বৈচিত্র্য হবে এবং এ নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি হওয়াও বিচিত্র নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, বিয়ের আগে পাত্র ও পাত্রীর সাক্ষাৎ এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও চাপমুক্ত মতামত গ্রহণ করলে বড়ো কয়েকটা কল্যাণ লাভ করা যায়।
প্রথমত, এভাবে আল্লাহ্‌ তায়ালার বিধান এবং নবীজি (সা) এর শেখানো পদ্ধতির অনুশীলন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, শরীয়তের পূর্ণ অনুশীলনের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
তৃতীয়ত, এ ধরণের বিয়ে সংসারে স্থায়ী শান্তি ও দম্পতির মাঝে পারস্পরিক সমঝোতার পক্ষে সহায়ক হয়।
চতুর্থত, নারী ও পুরুষকে তাদের জোড়া বেছে নেবার যে অধিকার ও স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে, তার যথাযথ প্রতিপালন হয় এবং এই অধিকার ও স্বাধীনতা হরণের জুলুম থেকে সমাজ ও পরিবারের বেঁচে যায়।
পঞ্চমত, বিবাহ পরবর্তী অনেক বড়ো বড়ো অকল্যাণ থেকে নিরাপদে থাকা যায়। এর মধ্যে প্রথম অকল্যাণটিই হলো, বিয়ের রাতে স্বামীকে দেখে স্ত্রীর পছন্দ না হওয়া অথবা স্ত্রীর চেহারা দেখে স্বামীর ভেতর হতাশা তৈরি হওয়া। এই ধাক্কার ধকল সারা জীবনই বহন করতে হয়। কেউ কেউ এই ধকল সামলে নিলেও, যেকোন তিক্ত পরিস্থিতিতে এই চিন্তার পুনরায় উদয় হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। তখন বিষয়টা ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’র মতোই যন্ত্রণাদায়ক হয়।
এবং সবশেষে, বিয়ের সম্পর্কটি পাত্র ও পাত্রীর নিকট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পায়। যেমন, বিয়ের পর উভয়ের মনে এই হতাশা তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় না যে, তাদের অভিভাবক তাদেরকে ঠকিয়েছেন। এই ধারণা তৈরি হওয়ার সাথে সাথে, মূলত, বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতার মৃত্যু ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন, দুইটা জিন্দা লাশ সংসার করছে।
আমাদের দেশে বিয়ের নামে পক্ষান্তরে কুরবানির অনুষ্ঠানই সম্পন্ন হয়। পশু কুরবানি করা হয়, আল্লাহ্ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। এতে আছে অশেষ বরকত ও সামষ্টিক কল্যাণ। আর বিয়ের নামে এখানে দু’টো জীবনকে কুরবানি করা হয়, পরিবার ও আত্মীয়ের লোকদেরকে খুশি করার জন্য। এই পদ্ধতিতে যে অকল্যাণ আছে, তার বিষাক্ততা এতোই সংক্রামক যে, এর বিষক্রিয়া কেবল স্বামী ও স্ত্রীর ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাদের সম্পর্ক থেকে লব্ধ প্রজন্ম এবং পরিবার ও সমাজে এটি ক্রিয়াশীল থাকে। এই সম্পর্কের তিক্ততা থেকে সমাজের অনেক আগাছা ও পরগাছার জন্ম হয়, স্থান লাভ করে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক উগ্রতা ও বৈকল্যের।
ইসলামের এতো মহান একটা স্তম্ভে কুপ্রথার পংকিলতা মেখে দিয়ে কী বীভৎস করে ফেলেছি আমরা! এর ফলে আমাদের সমাজে সেই স্তম্ভে এখন বিকৃতির ফাটল ধরেছে। আমরা এর ফল প্রতিনিয়তই ভোগ করছি। অন্যদিকে, কী কৌতুকোদ্দীপক বিষয় দেখুন, যে ছেলে বা মেয়ে চোখ বন্ধ করে বাবা মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে কুরবানি হন, তাঁদের নামে উচ্চকিত প্রশংসা হয়। অথচ, এই কাজ আল্লাহ্‌ তায়ালা ও রাসূল (সা) এর নির্দেশের সুস্পষ্ট লংঘন।
এর পরিবর্তন দরকার। পরিবর্তন করবে কে? আপনি আমিই করবো। আমরা অনেকেই হয়তো নিজের জীবনে এটা বাস্তবায়ন করতে পারবো না। হয়তো নিষ্ঠুর বিবেকহীন সমাজের বলী হবো। কারণ, আমরা এখনও পরাধীন, ক্ষমতাহীন। কিন্তু, আমরা তো চাইলেই আমাদের বংশধরদের থেকে এই কুপ্রথাকে বিদায় জানাতে পারি। ইসলামের একটা বিলুপ্তপ্রায় মৌলিক বিধানকে আমাদের বংশধারায় চালু করে দিয়ে, অশেষ সদাকায়ে জারিয়ার সুফল ভোগ করতে পারি। সারাজীবন ত্রুটিযুক্ত অসংখ্য কাজের মাঝে, এই একটি কাজ প্রজন্মান্তরে আমাদেরকে বিপুল মর্যাদায় ভূষিত করবে। এছাড়া, পারস্পরিক আলাপ, দেখা সাক্ষাত ও মিল মহব্বতের মধ্য দিয়ে যে সম্পর্কের গোড়াপত্তন হবে, ছোটবড় অসংখ্য জুলুম ও পাপাচারের পথ সেটা বন্ধ করে দেবে। আখিরাতে আল্লাহ্‌র কাছে দেখানোর মতো এর চেয়ে উত্তম আর সহজ আমল আর কয়টা আছে?
-তানভীর আহমাদ সিদ্দিকী।
বন্দর, চট্টগ্রাম।

হেয় না করা

 

অনেক দাড়িওয়ালা ভাই দাড়িবিহীন ভাইদের বাকা চোখে দেখে ।
অনেক পর্দাওয়ালা নারী পর্দাহীন নারীদের অবজ্ঞা-ঘৃণার চোখে দেখে। অনেক নামাজি ব্যক্তি বেনামাজি ব্যক্তিকে ঘৃণা-নীচতার দৃষ্টিতে দেখে। এমন ঠিক নয়। এটাও এক ধরনের অহংকার; ইবাদতের অহংকার, নিজেকে অধিক মুমিন ভাবার আত্মগৌরব। যার ভেতরে নামাজ, পর্দা, ইবাদতের এমন আত্মগৌরব তৈরি হবে তিনি ওই পর্দাহীন নারী আর বেনামাজির চেয়েও হতভাগা।
শেখ সাদি রহ. যখন বয়সে কেবল কিশোর, তখন তিনি তার বাবার সঙ্গে কোনো এক বুজুর্গের খানকায় গিয়েছিলেন। সেখানে ওইদিন ইবাদতের কোনো মজমা চলছিল, অনেক ভক্ত-মুরিদান জমা হয়েছিলেন সেখানে। তো, ইবাদত-বন্দেগি শেষ করে রাতেরবেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন।
শেখ সাদির বাবা ভোররাতে ছেলেকে জাগিয়ে তুললেন তাহাজ্জুদের জন্য। কিশোর শেখ সাদি তাহাজ্জুদের জন্য অজু করে যখন খানকায় ফিরে আসছিলেন তখন দেখেন, ভক্ত-মুরিদদের অনেকে ঘুমে বিভোর হয়ে আছে, তাহাজ্জুদ আদায়ের ব্যাপারে তাদের কোনো খবরই নেই।
এটা দেখে শেখ সাদি আফসোস করে তার বাবাকে বললেন, ‘দেখলে বাবা, এই লোকেরা ইবাদত করার জন্য এসেছে এখানে অথচ তারা তাহাজ্জুদ নামাজটাই পড়ছে না।’
শেখ সাদির বাবা ছেলেকে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘ঘুমিয়ে যাদের তাহাজ্জুদ কাজা হয়ে গেল তারা যতটুকু হতভাগা, তার চেয়ে অনেক বেশি হতভাগা তুমি—যে নিজের তাহাজ্জুদ নিয়ে আত্মগর্বিত হয়ে পড়েছো।’
মানুষের জন্য অন্তরে ভালোবাসার মহাসাগর তৈরি করুন। কী পুণ্য করবেন অপরকে ঘৃণা করে? কী লাভ হবে আরেকজনকে নীচ-অপদস্থ ভেবে? আপনি জান্নাতে যাবেন, আরেকজনের জন্যও জান্নাতের রাস্তা সহজ করুন। আল্লাহর জান্নাত এত ছোট নয় যে শত কোটি মানুষকে দিলেও আপনার জন্য কম পড়ে যাবে। মানুষকে জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা দেখান, জাহান্নাম থেকে তাদের বাঁচাতে এমনভাবে হৃদয়ের তড়প জাগিয়ে তুলুন, যেভাবে ভাই তার ভাইকে আগুনে পড়তে দেখলে তড়পায়। ওটাই মুসলমানিত্ব। মুসলমানিত্বের মধ্যে ঘৃণার কোনো স্থান নেই, ইবাদতের আত্মগৌরবেরও কোনো স্থান নেই!(©-salahuddin Jahangir)
১।আপনার আশেপাশেই এমনও অনেক আছে যার হৃদয় টা চায় প্র্যাকটিসিং মুসলিম হতে কিন্তু এই সমজটা হতে দেয়না,তাকে দেখে অবহেলা ঘৃণার দৃষ্টিতে না দেখে তার কাধে হাত দিয়ে বলুন হে প্রিয় ভাই আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি চলো মসজিদে যাই নামাযটা পড়ে আসি।
২।কোনো ইয়ো ইয়ো বয় কে দেখে ঘৃণার দৃষ্টিতে না তাকিয়ে তাকে হাসিমুখে সালাম দিয়ে তারসাথে গল্প করুন, তার খবর নিন, হয়তো কোনো একদিন তার মনটা দ্বীন পালনে ব্যাকুল হয়ে উঠবে।
৩।কেউ হয়তো ইসলাম মানে শুধু নামায রোজা হজ্ব পালনই বুঝে,তাকে আপনার থেকে আলাদা ভাববেন না।তার সাথে মিশে কোনো একদিন চা খেতে খেতে বলুন প্রিয় ভাই ইসলাম পুরো একটা জীবনব্যাবস্থা,রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ভাবে সংসার পরিচালনা,সামাজিক, অর্থনৈতিক ,রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রই ইসলামী শরীয়াহ এর অন্তর্ভুক্ত।চলো আমাদের জীবনটাকে ইসলামের রঙে রঙিন করি।
৪।বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডার ফাকে বলুন দেখ আমরাতো দুনিয়ায় সুখের জন্য কতো পড়ালেখা করি কতো পরিশ্রম করি অথচ ইসলামের মৌলিক আকীদা নিয়েই আমরা অনেকে জানিনা! তাদেরকে সময় দিন ।
আমাদের আত্নগৌরব নিজেকে অধিক মুমিন ভাবার tendency পরিহার করা উচিত।এই উম্মাহ এর ক্রান্তিলগ্নে আপনি নিজ অবস্থান থেকে উম্মাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করুন,ত্যাগেই রয়েছে প্রকৃত সুখ ও সফলতা।