Wednesday, April 28, 2021

ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্কের মৌলিক শর্ত বনাম প্রচলিত সামাজিক খোঁয়াড় Marital Relation in Islam

 

ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্কের মৌলিক শর্ত বনাম প্রচলিত সামাজিক খোঁয়াড়

আমাদের সমাজে পারিবারিক পরিমণ্ডলে স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসার ছড়াছড়ি খুব একটা চোখে পড়ে না। অথচ বিয়ের পেছনে ইসলামের যেসব মহান উদ্দেশ্য আছে, তার মধ্যে এটিও একটি। ইসলাম চায়, স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসার সাবলীল বহিঃপ্রকাশ ঘটুক। কিন্তু, আমাদের সমাজে আমরা কি এ ধরণের কোন পরিবেশ অনুভব করি? ভালোবাসার কোন সুগন্ধ কি পরিবারগুলোর দরজা জানালার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে? আসে না। আসে না কেন? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। যেগুলোর উল্লেখ করা হলে, বাণীর উৎসের প্রতি এই প্রথা নির্ভর সমাজের অলঙ্ঘ্য দুর্গ থেকে, প্রবল শব্দে উষ্মার কামান গর্জে উঠতে পারে। তবুও আমাদেরকে কথা বলতে হবে। থেমে গেলে চলবে না। আজ আমি কেবল সবচে বড়ো জুলুমটার কথাই বলবো।
আমাদের সমাজের সাধারণ প্রথা হলো, বিয়ের আলোচনার টেবিলে পাত্র ও পাত্রীর অংশগ্রহণ না থাকা। কবুল বলার অধিকারটুকুই তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে, আল্লাহ্‌ তায়ালার নির্দেশ ও রাসূলে কারীম (সা) এর শেখানো পদ্ধতির সরাসরি খেলাফ, এই কুপ্রথা, কবে কিভাবে চালু হলো, তা কারো জানা আছে কি না সন্দেহ। এখন পর্যন্ত এই কুপ্রথা চালু আছে। অথচ, অধিকাংশ মেইনস্ট্রীম আলেম এ ব্যাপারে এখনও নীরব।
দেখুন, বিয়ের প্রশ্নে আমরা নিজেদেরকে অনেকটা গবাদিপশুর শ্রেণীতে ফেলে দিয়েছি। এখানকার অবস্থা দেখে মনে হয়, সংসার হলো, সন্তান উৎপাদনকারী খামার আর বিবাহ হলো এর বায়না দলীল। আমাদের দেশের বিবাহের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে, সংসারকে খামারবাড়ি ছাড়া আর কি বিশেষণেই বা ভূষিত করা যেতে পারে? দুইটা বিপরীত লিংগের প্রাণীকে একটা ছাদের নীচে রেখে দাও। এরপর প্রোডাকশনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকো। ভাবখানা তো এমনই। কেউ এর বিপরীত বলতে পারবেন না। অথচ মানুষ তো গবাদিপশু নয় যে, দুই জায়গা থেকে যেমন তেমনভাবে ধরে এনে একটা জোড়া মিলায়ে দিলেই হলো।
অথচ, বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিই হলো ভালোবাসার উপস্থিতি। ইসলামে সুস্পষ্ট ভাষায় স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়েছেন, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা এবং শরীয়তের মালিক- আল্লাহ্‌ তায়ালা।
“এবং তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যেনো তোমরা তাদের কাছে মানসিক শান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন”। সূরা আর রূমঃ ২১।
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে একটি দেহ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য স্বয়ং সেই বস্তু থেকে তৈরি করেছেন একটি জোড়া, যেনো তোমরা তার কাছ থেকে শান্তি ও আরাম হাসিল করতে পারো”। সূরা আ’রাফঃ ১৮৯।
“তারা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা হচ্ছো তাদের জন্য পোশাক”। আল বাকারাঃ ১৮৭
সুবহানাল্লাহ! কি সুন্দর উপমা ব্যবহার করলেন আল্লাহ্‌ তায়ালা! স্বামী আর স্ত্রীর ভালোবাসা যে কতো পবিত্র এবং আকাঙ্ক্ষিত বিষয়, তা বুঝানোর জন্য এই একটি উপমাই যথেষ্ট।
একইভাবে, কুরআনে কোন বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা না রাখার যে তুলাদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তা হলো দু'টি মানুষের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্ক।
“তোমরা (স্বামী ও স্ত্রী) তোমাদের মাঝে উত্তম আচরণের ব্যাপারখানা ভুলে যেও না”। আল বাকারাঃ ২৩৭
“তোমরা (স্বামীরা) হয় তাদেরকে (স্ত্রীদেরকে) উত্তম পন্থায় রেখে দাও অথবা উত্তম পন্থায় বিদায় দাও। শুধু কষ্ট দেবার উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। এতে তাদের অধিকার (অন্য পুরুষকে স্বামী হিসেবে বেছে নেওয়া) খর্ব করা হয়। যে ব্যক্তিই এমনটা করবে, সে নিজের উপরই জুলুম করবে। আল বাকারাঃ ২৩১
অর্থাৎ, মনের সাবলীল ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন স্ত্রীকে কোন স্বামীর সাথে ঘর করতে বাধ্য করতে, আল্লাহ্‌ তায়ালা নিষেধ করেছেন। কারণ স্ত্রীও একজন মানুষ। তার ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম আছে। জোর করে কোন পুরুষ মানুষের সাথে ঘর করতে তাকে বাধ্য করা যাবে না।
“যদি তোমরা আপোষে মিলেমিশে থাকো এবং পরস্পর সীমালংঘন করার ব্যাপারে সতর্ক থাকো, তাহলে আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই ক্ষমাকারী ও দয়াময়। আর যদি (মিলেমিশে থাকা সম্ভব না হয়) দম্পতি পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ্‌ তায়ালা আপন অসীম অদৃশ্য ভাণ্ডার থেকে উভয়কে সন্তুষ্ট করবেন”। সূরা আন নিসাঃ ১২৯-১৩০।
অর্থাৎ, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মিল-মিশ ও ভালোবাসার এমন ঘাটতি দেখা দিলো যে, তারা বিয়ের যে সীমা আছে তা লংঘন করে ফেলার আশংকা সৃষ্টি হলো, যেমন, পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়া, ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া, একজন আরেকজনের অধিকারে হাত দিয়ে ফেলা, অথবা হত্যা বা আত্মহত্যায় প্ররোচিত হওয়া। এমন পরিস্থিতি কখনোই ইসলাম কামনা করে না। এই পরিস্থিতিগুলো বিয়ের যে উদ্দেশ্য ছিলো, একজন অন্যজনের কাছে শান্তি ও রহমের আশ্রয় পাওয়া, সেই উদ্দেশ্যকে লংঘন করছে। এখানে এরকম সীমালংঘনের আশংকা দেখা দিলে দাম্পত্য সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলতে বলা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আল্লাহ্‌র ভাষ্য মতে, এমনটা করলে, আল্লাহ্র অসস্তুষ্টিতে পড়ার আশংকা তো নেই-ই বরং, আল্লাহ্‌র অসীম অদৃশ্য ভাণ্ডার থেকে উভয়কে সন্তুষ্ট করার আশাও দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং, এ থেকেও আমরা বুঝলাম যে দাম্পত্য সম্পর্কের আসল স্তম্ভই হলো পারস্পরিক বোঝা পড়া ও ভালোবাসার উপস্থিতি। দু’টি বৈরি সম্পর্ককে নিছক সমাজের চাহিদা পূরণের জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখা শরিয়তের উদ্দেশ্য নয়।
দেখা সাক্ষাৎ এবং পরিচয় ছাড়াই এই সম্পর্ক তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। কুরআনের ভাষায়,
“এতে তোমাদের কোন গুনাহ নেই যে, এসব নারীদের বিবাহের প্রস্তাব সম্পর্কে ইংগিতে কোন কথা বলো অথবা নিজেদের অন্তরে তা গোপন রাখো। আল্লাহ্‌ জানেন যে, শিগগীর তোমরা তাদের ব্যাপারে আলোচনা করবে। কিন্তু, তাদেরকে গোপনে প্রতিশ্রুতি দিও না। হ্যাঁ, নিয়ম মাফিক (খোলামেলা) আলোচনা করতে পারো’। সূরা বাকারাঃ ২৩৫।
দেখা সাক্ষাতের ব্যাপারে রাসূলে কারীম (সা) নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট।
রাসূলে কারীম (সা) বলেছেন,
"(বিয়ে করতে চাইলে) প্রথমে তাকে দেখে নাও"। -তিরমিযী
আরেক জায়গায় বলেছেন,
"তুমি ভালো করে দেখো, তার (পাত্রীর) কোন বিষয়টা তাকে বিয়ে করার ব্যাপারে তোমাকে আগ্রহী করে"। - আবু দাউদ, মেশকাত
এছাড়াও, তিনি (সা) পাত্রকে পাত্রীর বৈধ অঙ্গগুলো দেখতে বলেছেন। - আবু দাউদ, মেশকাত
লক্ষ্য করুন, উপরের কুরআন ও হাদীসের এই কথাগুলো পাত্রের বাবা, মা, অভিভাবক কিংবা আত্মীয় স্বজনকে বলা হয়নি, বলা হয়েছে স্বয়ং পাত্রকে।
একইভাবে পাত্রীদেরকেও এই অধিকার দেওয়া হয়েছে।
“বালেগা বিবাহিতা নারীর অনুমতি ব্যতীত যেমন বিয়ে দেওয়া যাবে না, তেমনি বালেগা কুমারীকেও তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না। সাহাবাগণ (রা) জিজ্ঞেস করলেন, তার (কুমারী মেয়ের) অনুমতি কিভাবে নেওয়া যেতে পারে (যদি মেয়ে লজ্জায় কথা না বলে)? তিনি বলেন, তার চুপ থাকাই অনুমতি”। -সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
শুধু তাই নয়, আমরা অনেকেই মনে করি, স্বামীর পার্থিব যোগ্যতা, নীতি নৈতিকতা অথবা ধার্মিকতাই সব, পাত্রের চেহারা তথা তার দেহের গঠন ধর্তব্য নয়; ইসলাম কিন্তু তা বলে না।
সাবিত ইবনে কায়েস (রা) এর একজন স্ত্রী জামীলা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে নিচের ভাষায় বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলেনঃ
“হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা)! আমার মাথা ও তার মাথাকে কোন বস্তু কখনো একত্র করতে পারবে না। আমি (বিয়ের পর) ঘোমটা তুলে তাকাতেই দেখলাম, সে কতগুলো লোকের সাথে সামনে থেকে আসছে। (তার মানে বিয়ের আগে জামিলা (রা) সাবিত (রা) কে দেখেননি।) কিন্তু আমি ওকে ওদের সবার চেয়ে বেশী কালো, সবচেয়ে বেঁটে এবং সবচেয়ে কুৎসিত চেহারার দেখতে পেলাম। আল্লাহ্‌র শপথ! আমি তার দীনদারী ও চারিত্রিক কোন ত্রুটির কারণে তাকে অপসন্দ করছি, এমন না, বরং তার কুৎসিত চেহারাই আমার কাছে অসহনীয়”।
এই অভিযোগ শুনে নবীজী (সা) বললেনঃ “সে তোমাকে (মোহরানা হিসেবে) যে বাগানটি দিয়েছিলো, তুমি কি তা ফেরত দেবে?”
উত্তরে জামীলা (রা) বললেনঃ "হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা)! আমি তা ফেরত দিতে রাজি আছি, বরং সে যদি আরও বেশি কিছু চায়, তাও দিবো"।
নবী (সা) তখন তাকে শুধু বাগানটি দিতে বললেন, আর সাবিত (রা) কে বললেন, তিনি যেনো বাগানটি গ্রহণ করে জামীলা (রা) কে এক তালাক দেন।
-ইবনে জারীর।
প্রত্যেক মানুষ স্বতন্ত্র রুচিবোধ, পছন্দ অপছন্দ, জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি, স্বভাব প্রকৃতি, অভ্যাস ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ও ধারণার অধিকারী। এই বৈশিষ্ট্য ও ধারণার স্বাতন্ত্র্যবোধ তাকে আলাদা ব্যক্তিত্বে রূপ দেয়। এভাবেই এক একজন মানুষ অন্য আর এক জন ব্যক্তি থেকে ভিন্ন সত্ত্বা লাভ করে। এই বৈশিষ্ট্য তাকে সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সাবধানি করে তোলে, সে হয়ে উঠে নৈর্বাচনিক। সব ধরণের মানুষের সাথে তার সখ্য হয় না। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিরাই তার ঘনিষ্ঠ হতে পারে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে তার বন্ধু নির্বাচনে দক্ষ করে তোলে। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিত্বের সাথে তার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে পড়ে।
“Birds of the same feathers flock together.”
বিবাহের মতো সুদূরপ্রসারী একটি সম্পর্ক করার আগে পাত্র ও পাত্রীর ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের এই দিকগুলো কি আমরা বিবেচনা করি? একজন পাত্র কেমন ধরণের নারীকে তার জীবন সংগীনি হিসেবে পেতে চান, তা কি আমরা মূল্যায়ন করি? যখন একজন লো কোয়ালিটির রমনীর সাথে হাই কোয়ালিটির কোন পুরুষকে জুড়ে দেওয়া হয় অথবা লো কোয়ালিটির পুরুষের সাথে হাই কোয়ালিটির তরুণীকে বেঁধে দেওয়া হয়, তখন তাদের উপর কতো বড় জুলুম করা হয়, তা কি আমরা উপলব্ধি করার কোশেশ করি! এই একটি জুলুম পরবর্তীতে ঐ পরিবারে কতো অসংখ্য জুলুমের সৃষ্টি করতে পারে, সে কথা কি আমরা ভেবে দেখি? আমৃত্যু এই অসম সম্পর্কে, খুনসুটি থেকে শুরু করে বড়ো ধরণের অঘটনও ঘটতে পারে। এসব অঘটন পরবর্তী প্রজন্মের উপর স্থায়ী রেখাপাত করে।
মহিলাদের ব্যাপারটা তো আরও হৃদয়বিদারক! একজন রমনী, বাবা-মাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য, স্বাভাবিক লজ্জাশীলতার কারণে অথবা পরিবারের শান্তি রক্ষার নিমিত্তে, পাত্রকে না দেখে শুনেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশে, অজানা মানুষদের ভীড়ে আসেন, সহায় শুধু স্বামীর দয়া ও সহানুভূতি। আবার, এই লোকটাকে বিয়ের আগে একবারের জন্যও তিনি দেখেননি, লোকটার দিকে তাকালে তার ভালো লাগবে না অন্তরে অনীহা সৃষ্টি হবে, এই বিষয়টাও পরিস্কার নয়, আবার দেখলেও তার ভালো লাগা মন্দ লাগার নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ যেখানে সন্দেহজনক বলে বিবেচ্য, তেমন পরিস্থিতিতে, এক বিপুল মানসিক দ্বান্দ্বিকতা আর অনিশ্চয়তা নিয়েই বাড়িঘর ও আপনজন ছেড়ে, সারা জীবনের তরে, নিশ্চিতভাবে ঐ লোকটার কাছে চলে যাওয়া, এটা কি সাধারণ মানের কোন ত্যাগ! এই ত্যাগ কি তারা স্বেচ্ছায় করেন? মনের আনন্দে করেন? না পরিবেশের চাপে পড়ে, বাধ্য হয়ে করেন? তারপর তার সাথে কি নোংরা, জঘন্য ও পৈশাচিক আচরণ করা হয়, প্রাসঙ্গিকতা রক্ষার খাতিরে সেসব প্রসঙ্গে নাই বা গেলাম।
এখানে অনেকেই হয়তো বলবেন যে, যারা দেখে, শুনে ও বুঝে সম্পর্ক করেন, তাদের কি কোন সমস্যাই হয় না। তাদের উত্তরে আমি বলবো, অবশ্যই হতে পারে বরং না হওয়াটাই তো অস্বাভাবিক। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের মিথষ্ক্রিয়ার দাবীই হলো, তাদের মধ্যে মতের বৈচিত্র্য হবে এবং এ নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি হওয়াও বিচিত্র নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, বিয়ের আগে পাত্র ও পাত্রীর সাক্ষাৎ এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও চাপমুক্ত মতামত গ্রহণ করলে বড়ো কয়েকটা কল্যাণ লাভ করা যায়।
প্রথমত, এভাবে আল্লাহ্‌ তায়ালার বিধান এবং নবীজি (সা) এর শেখানো পদ্ধতির অনুশীলন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, শরীয়তের পূর্ণ অনুশীলনের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
তৃতীয়ত, এ ধরণের বিয়ে সংসারে স্থায়ী শান্তি ও দম্পতির মাঝে পারস্পরিক সমঝোতার পক্ষে সহায়ক হয়।
চতুর্থত, নারী ও পুরুষকে তাদের জোড়া বেছে নেবার যে অধিকার ও স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে, তার যথাযথ প্রতিপালন হয় এবং এই অধিকার ও স্বাধীনতা হরণের জুলুম থেকে সমাজ ও পরিবারের বেঁচে যায়।
পঞ্চমত, বিবাহ পরবর্তী অনেক বড়ো বড়ো অকল্যাণ থেকে নিরাপদে থাকা যায়। এর মধ্যে প্রথম অকল্যাণটিই হলো, বিয়ের রাতে স্বামীকে দেখে স্ত্রীর পছন্দ না হওয়া অথবা স্ত্রীর চেহারা দেখে স্বামীর ভেতর হতাশা তৈরি হওয়া। এই ধাক্কার ধকল সারা জীবনই বহন করতে হয়। কেউ কেউ এই ধকল সামলে নিলেও, যেকোন তিক্ত পরিস্থিতিতে এই চিন্তার পুনরায় উদয় হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। তখন বিষয়টা ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’র মতোই যন্ত্রণাদায়ক হয়।
এবং সবশেষে, বিয়ের সম্পর্কটি পাত্র ও পাত্রীর নিকট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পায়। যেমন, বিয়ের পর উভয়ের মনে এই হতাশা তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় না যে, তাদের অভিভাবক তাদেরকে ঠকিয়েছেন। এই ধারণা তৈরি হওয়ার সাথে সাথে, মূলত, বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতার মৃত্যু ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন, দুইটা জিন্দা লাশ সংসার করছে।
আমাদের দেশে বিয়ের নামে পক্ষান্তরে কুরবানির অনুষ্ঠানই সম্পন্ন হয়। পশু কুরবানি করা হয়, আল্লাহ্ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। এতে আছে অশেষ বরকত ও সামষ্টিক কল্যাণ। আর বিয়ের নামে এখানে দু’টো জীবনকে কুরবানি করা হয়, পরিবার ও আত্মীয়ের লোকদেরকে খুশি করার জন্য। এই পদ্ধতিতে যে অকল্যাণ আছে, তার বিষাক্ততা এতোই সংক্রামক যে, এর বিষক্রিয়া কেবল স্বামী ও স্ত্রীর ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাদের সম্পর্ক থেকে লব্ধ প্রজন্ম এবং পরিবার ও সমাজে এটি ক্রিয়াশীল থাকে। এই সম্পর্কের তিক্ততা থেকে সমাজের অনেক আগাছা ও পরগাছার জন্ম হয়, স্থান লাভ করে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক উগ্রতা ও বৈকল্যের।
ইসলামের এতো মহান একটা স্তম্ভে কুপ্রথার পংকিলতা মেখে দিয়ে কী বীভৎস করে ফেলেছি আমরা! এর ফলে আমাদের সমাজে সেই স্তম্ভে এখন বিকৃতির ফাটল ধরেছে। আমরা এর ফল প্রতিনিয়তই ভোগ করছি। অন্যদিকে, কী কৌতুকোদ্দীপক বিষয় দেখুন, যে ছেলে বা মেয়ে চোখ বন্ধ করে বাবা মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে কুরবানি হন, তাঁদের নামে উচ্চকিত প্রশংসা হয়। অথচ, এই কাজ আল্লাহ্‌ তায়ালা ও রাসূল (সা) এর নির্দেশের সুস্পষ্ট লংঘন।
এর পরিবর্তন দরকার। পরিবর্তন করবে কে? আপনি আমিই করবো। আমরা অনেকেই হয়তো নিজের জীবনে এটা বাস্তবায়ন করতে পারবো না। হয়তো নিষ্ঠুর বিবেকহীন সমাজের বলী হবো। কারণ, আমরা এখনও পরাধীন, ক্ষমতাহীন। কিন্তু, আমরা তো চাইলেই আমাদের বংশধরদের থেকে এই কুপ্রথাকে বিদায় জানাতে পারি। ইসলামের একটা বিলুপ্তপ্রায় মৌলিক বিধানকে আমাদের বংশধারায় চালু করে দিয়ে, অশেষ সদাকায়ে জারিয়ার সুফল ভোগ করতে পারি। সারাজীবন ত্রুটিযুক্ত অসংখ্য কাজের মাঝে, এই একটি কাজ প্রজন্মান্তরে আমাদেরকে বিপুল মর্যাদায় ভূষিত করবে। এছাড়া, পারস্পরিক আলাপ, দেখা সাক্ষাত ও মিল মহব্বতের মধ্য দিয়ে যে সম্পর্কের গোড়াপত্তন হবে, ছোটবড় অসংখ্য জুলুম ও পাপাচারের পথ সেটা বন্ধ করে দেবে। আখিরাতে আল্লাহ্‌র কাছে দেখানোর মতো এর চেয়ে উত্তম আর সহজ আমল আর কয়টা আছে?
-তানভীর আহমাদ সিদ্দিকী।
বন্দর, চট্টগ্রাম।

হেয় না করা

 

অনেক দাড়িওয়ালা ভাই দাড়িবিহীন ভাইদের বাকা চোখে দেখে ।
অনেক পর্দাওয়ালা নারী পর্দাহীন নারীদের অবজ্ঞা-ঘৃণার চোখে দেখে। অনেক নামাজি ব্যক্তি বেনামাজি ব্যক্তিকে ঘৃণা-নীচতার দৃষ্টিতে দেখে। এমন ঠিক নয়। এটাও এক ধরনের অহংকার; ইবাদতের অহংকার, নিজেকে অধিক মুমিন ভাবার আত্মগৌরব। যার ভেতরে নামাজ, পর্দা, ইবাদতের এমন আত্মগৌরব তৈরি হবে তিনি ওই পর্দাহীন নারী আর বেনামাজির চেয়েও হতভাগা।
শেখ সাদি রহ. যখন বয়সে কেবল কিশোর, তখন তিনি তার বাবার সঙ্গে কোনো এক বুজুর্গের খানকায় গিয়েছিলেন। সেখানে ওইদিন ইবাদতের কোনো মজমা চলছিল, অনেক ভক্ত-মুরিদান জমা হয়েছিলেন সেখানে। তো, ইবাদত-বন্দেগি শেষ করে রাতেরবেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন।
শেখ সাদির বাবা ভোররাতে ছেলেকে জাগিয়ে তুললেন তাহাজ্জুদের জন্য। কিশোর শেখ সাদি তাহাজ্জুদের জন্য অজু করে যখন খানকায় ফিরে আসছিলেন তখন দেখেন, ভক্ত-মুরিদদের অনেকে ঘুমে বিভোর হয়ে আছে, তাহাজ্জুদ আদায়ের ব্যাপারে তাদের কোনো খবরই নেই।
এটা দেখে শেখ সাদি আফসোস করে তার বাবাকে বললেন, ‘দেখলে বাবা, এই লোকেরা ইবাদত করার জন্য এসেছে এখানে অথচ তারা তাহাজ্জুদ নামাজটাই পড়ছে না।’
শেখ সাদির বাবা ছেলেকে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘ঘুমিয়ে যাদের তাহাজ্জুদ কাজা হয়ে গেল তারা যতটুকু হতভাগা, তার চেয়ে অনেক বেশি হতভাগা তুমি—যে নিজের তাহাজ্জুদ নিয়ে আত্মগর্বিত হয়ে পড়েছো।’
মানুষের জন্য অন্তরে ভালোবাসার মহাসাগর তৈরি করুন। কী পুণ্য করবেন অপরকে ঘৃণা করে? কী লাভ হবে আরেকজনকে নীচ-অপদস্থ ভেবে? আপনি জান্নাতে যাবেন, আরেকজনের জন্যও জান্নাতের রাস্তা সহজ করুন। আল্লাহর জান্নাত এত ছোট নয় যে শত কোটি মানুষকে দিলেও আপনার জন্য কম পড়ে যাবে। মানুষকে জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা দেখান, জাহান্নাম থেকে তাদের বাঁচাতে এমনভাবে হৃদয়ের তড়প জাগিয়ে তুলুন, যেভাবে ভাই তার ভাইকে আগুনে পড়তে দেখলে তড়পায়। ওটাই মুসলমানিত্ব। মুসলমানিত্বের মধ্যে ঘৃণার কোনো স্থান নেই, ইবাদতের আত্মগৌরবেরও কোনো স্থান নেই!(©-salahuddin Jahangir)
১।আপনার আশেপাশেই এমনও অনেক আছে যার হৃদয় টা চায় প্র্যাকটিসিং মুসলিম হতে কিন্তু এই সমজটা হতে দেয়না,তাকে দেখে অবহেলা ঘৃণার দৃষ্টিতে না দেখে তার কাধে হাত দিয়ে বলুন হে প্রিয় ভাই আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি চলো মসজিদে যাই নামাযটা পড়ে আসি।
২।কোনো ইয়ো ইয়ো বয় কে দেখে ঘৃণার দৃষ্টিতে না তাকিয়ে তাকে হাসিমুখে সালাম দিয়ে তারসাথে গল্প করুন, তার খবর নিন, হয়তো কোনো একদিন তার মনটা দ্বীন পালনে ব্যাকুল হয়ে উঠবে।
৩।কেউ হয়তো ইসলাম মানে শুধু নামায রোজা হজ্ব পালনই বুঝে,তাকে আপনার থেকে আলাদা ভাববেন না।তার সাথে মিশে কোনো একদিন চা খেতে খেতে বলুন প্রিয় ভাই ইসলাম পুরো একটা জীবনব্যাবস্থা,রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ভাবে সংসার পরিচালনা,সামাজিক, অর্থনৈতিক ,রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রই ইসলামী শরীয়াহ এর অন্তর্ভুক্ত।চলো আমাদের জীবনটাকে ইসলামের রঙে রঙিন করি।
৪।বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডার ফাকে বলুন দেখ আমরাতো দুনিয়ায় সুখের জন্য কতো পড়ালেখা করি কতো পরিশ্রম করি অথচ ইসলামের মৌলিক আকীদা নিয়েই আমরা অনেকে জানিনা! তাদেরকে সময় দিন ।
আমাদের আত্নগৌরব নিজেকে অধিক মুমিন ভাবার tendency পরিহার করা উচিত।এই উম্মাহ এর ক্রান্তিলগ্নে আপনি নিজ অবস্থান থেকে উম্মাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করুন,ত্যাগেই রয়েছে প্রকৃত সুখ ও সফলতা।

সালামের কয়েকটি ভুল

 May be an image of text that says 'প্রচলিত ভুল Gg Call পর্ব:- shutterstsck Criee সালামের কয়েকটি ভুল Iftekar Husain'

 

সালামের কয়েকটি ভুল

১. সালামের জবাব দিয়ে আবার সালাম দেওয়া

এ রীতিটা ভুল । উত্তম হল সালাম পাওয়ার অপেক্ষা না করে আগে সালাম দেওয়া । কিন্তু কেউ সালাম দিয়ে দিলে তখন দায়িত্ব হল শুধু সালামের উত্তর দেওয়া ।

২. সালামের জবাব না দিয়ে আবার সালাম দেওয়া

এ রীতিটা ও ভুল । বড় কেউ যদি আগে সালাম দিয়ে ফেলে, তখন আমাদের অনেকেই জবাব দিতে লজ্জাবোধ করে । তাই জবাব না দিয়ে নতুন করে সালাম দেয় । এ রীতি প্ররিহাযোগ্য । কেউ সালাম দিলে তার জবাব দেওয় ওয়াজিব । তাই জবাবই দিতে হবে ।

৩. কাউকে সালাম দেওয়া পর ‘সালাম দিয়েছি’ বলা

সালাম দেওয়ার পর উত্তর পেলে আমরা সাধারণত বলে থাকি ‘সালাম দিয়েছি ।’ এভাবে বলা ঠিক নয় । নিয়ম হল আবার সালাম দেওয়া । শ্রোতাকে যতাযতভাবে শুনিয়ে সালাম দিতে হবে । সালামের উত্তর যেমন সালামদাতাকে শুনিয়ে দিতে হয়, তেমনি সালামও শ্রোতাকে শুনিয়ে দিতে হয় ।

৪. মনে মনে বা নিম্নস্বরে সালামের জবাব দেওয়া

এ অভ্যাস প্ররিহাযোগ্য । সালামদাতাকে শুনিয়েই সালামের জবাব দেবে ।

৫. অসময়ে সালাম দেওয়া

কুরআন হাদীসের আলোকে একথা স্পষ্ট যে, সালাম হচ্ছে সাক্ষাতের বিভিন্ন আদবসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব । সালাম, মুসাফাহা, মুআনাকা ইত্যাদি এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সঙ্গে দেখা হলে করার মতো কিছু আমল, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন । কিন্তু দেখা যায় দুআ বা মুনাজাত শেষ হলে অনেকে সালাম দিয়ে বসেন । এটা একটা ভিত্তিহীন রেওয়াজ । দুআ বা মুনাজাত শেষ হওয়ার সঙ্গে সালামের কোন সম্পর্ক নেই । তেমনি মুসাফাহা, মুআনাকার কোন সম্পর্ক নেই ।

৬. সালামের উচ্চারণে ভুল

সালাম একটি দুআ । ইসলামের শিআর ও প্রতীক পর্যায়ের একটি আমল । এর সহীহ উচ্চারণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি । কমপক্ষে এতটুকু বিশুদ্ধ উচ্চারণ অবশ্যই জরুরি, যার দ্বারা অর্থ ঠিক থাকে ।

‎‎ ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ‎‎

আরবী দেখে এর উচ্চারণ শিখে নেওয়া উচিত । অন্যথায় ع ও ح ইত্যাদি হরফের যতাযত মাখরাজ আদায় হয় না । অনেকে অসাবধানতা বা তাড়াহুড়োর কারণে ভুল উচ্চারণে সালাম দিয়ে থাকে । এমনটা অনুচিত । সালামের ভুল উচ্চারণের কয়েকটি রূপ:
১.স্লামালাইকুম, ২. সালামালাইকুম, ৩. আস্লামালাইকুম, ৪. আস্লামুআলাইকুম, ৫. সেলামালাইকুম, ৬. ইস্লামালাইকুম, ৭. আচ্ছালামু আলাইকুম ইত্যাদি ।
সুত্র:- প্রচলিত ভুল, পৃষ্টা:- ৩৮

 

বাঙ্গি নিয়ে অনেক রকমের ট্রল

 No photo description available.

 

ইদানিং বাঙ্গি নিয়ে অনেক রকমের ট্রল দেখা যাচ্ছে…
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না।”
[বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৮
ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৩৮২]
সুতরাং, তোমার যদি বাঙ্গি খুবই অপছন্দের হয়, খেও না। তবুও বাঙ্গি নিয়ে হাসি-তামাশা করোনা, এবং যারা সেটা করছে তাদেরকেও প্রোমোট করোনা। কারণ, প্রতিটা ফলই আল্লাহর নিয়ামত। তুমি এটা নিয়ে হাসিঠাট্টা করছো মানে আল্লাহর নিয়ামত নিয়ে হাসিঠাট্টা করছো। এমন একটা ভাব যেন, আল্লাহ এটাকে সৃষ্টি করে 'অন্যায়' করে ফেলেছেন। (নাঊযুবিল্লাহ)
যখন তুমি বলো ‘আল্লাহ, হয় এই বাঙ্গি দুনিয়ার থেকে উঠায় নাও, নইলে আমারে উঠায় নাও’ তখন তুমি সরাসরি আল্লাহর সাথেই বেয়াদবি করে ফেললে যা তাওবা ব্যতীত ক্ষমার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং, কথাবার্তা বলার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
যারা যুক্তি দিতে চাচ্ছো– আরে এটা তো ‘যাস্ট ফান’ করে বলছি, এসবকিছু এত সিরিয়াসভাবে নিলে হয় নাকি?
তাদেরকে বলি—
“বান্দা অনেক সময় (ঠাট্টাচ্ছলে) এমন অনেক কথাই বলে যাতে সে গুরুত্ব দেয় না, অথচ সেই কথা আল্লাহ্‌কে অসন্তুষ্ট করে। ফলে সেই কথাই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।”
[বুখারী; অধ্যায় : ৮, খণ্ড : ৭৬, হাদীস : ৪৮৫]
একই নসীহত এরকম অন্যান্য কথাগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—
১. আল্লাহ একটা দড়ি ফালাও, উইঠা যাই। (আল্লাহকে হুকুম করা)
২. এটা দেখার আগে আল্লাহ আমার চোখ অন্ধ করে দিলো না ক্যান? (আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপত্তি)
৩. আল্লাহ আমারে উঠায় নাও (মৃত্যুকামনা)
আর, যারা এসব করে তাদের উদ্দেশ্যে—
“তারা আল্লাহর যথোচিত সম্মান করে না।”
[সূরা যুমার, আয়াত ৬৭]
সুতরাং, যারা আল্লাহকে সম্মান করে না, আমরা সামান্য একটু 'ফান' করতে গিয়ে তাদের দলভূক্ত না হই।
“তোমরা কেউ কখনও মৃত্যুকামনা করোনা”
[মুসলিম, হাদীস-৬৯৯৫]
“যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে সে যেন উত্তম কথা বলে নয়ত চুপ থাকে”
[বুখারী; অধ্যায়: ৮, খণ্ড: ৭৬, হাদীস: ৪৮২]

 

 

রুকু ধরার জন্য দৌড়ে আসা

 May be an image of text that says '"রাকাত বা রুকু ধরার জন্য দৌড়ানো যা একটি মারাত্মক ভুল"'

 

দুইটা বিষয় আমরা প্রায় অনেকেই করে থাকি,
১.নামাজের জন্য দৌড়ে আসা।
২.রুকু ধরার জন্য দৌড়ে আসা।
হ্যাঁ, এই দুইটা বিষয় নিতান্তই আমরা দেখে থাকি।হয় নামাজের জন্য দৌড়াই আর না হয় রুকু বা রাকাত ধরার জন্য দৌড়াই।এর পর দৌড়ানোর কারনে নামাজে দাঁড়িয়ে হাপাতে থাকি।
কিন্তু, আমরা কি জানি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পছন্দ করেন না??আমরা কি জানি উনি এমন করতে নিষেধ করেছেন??
হজরত আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে নামাজ পড়ছিলাম, নামাজরত অবস্থায় তিনি লোকের ছুটাছুটির শব্দ অনুভব করলেন। নামাজা শেষে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কী করছিলে’? তারা আরজ করল, ‘আমরা নামাজের জন্য তাড়াতাড়ি আসছিলাম’। আল্লাহর রাসুল (স.) বললেন, ‘এরূপ কখনো করো না। শান্তিশৃঙ্খলা ও ধীরস্থিরভাবে নামাজের জন্য আসবে, তাতে যে কয় রাকাত ইমামের সঙ্গে পাবে পড়ে নেবে, আর যা ছুটে যায় তা ইমামের নামাজের পর পূর্ণ করে নেবে’। [বোখারি শরীফ : ১/ ৩৮৭]
তাছাড়া, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, যখন সালাত শুরু হয়, তখন দৌড়িয়ে গিয়ে সালাতে যোগদান করবে না, বরং হেঁটে গিয়ে সালাতে যোগদান করবে। সালাতে ধীর-স্থিরভাবে যাওয়া তোমাদের জন্য অপরিহার্য। কাজেই জামা‘আতের সাথে সালাত যতটুকু পাও আদায় কর, আর যা ছুটে গেছে, পরে তা পূর্ণ করে নাও।(বুখারিঃ-৯০৮)
তাই,এক্ষেত্রে আপনি হয় সময় নিয়ে নামাজ পড়তে যাবেন অথবা ধিরস্থির ও শান্তভাবে হেঁটে গিয়ে যতোটুকু জামাতে শরিক হতে পারেন হবেন এবং বাকি নামাজ পরে নিজে শেষ করবেন।
আল্লাহ সবাইকে বুঝার তাউফিক দান করুক।

 

 

আল্লাহ রাসূলকে সাঃ সৃষ্টি না করলে এই পৃথিবী সৃষ্টি করতেন না—এই কথা কতটুকু সঠিক ?

 

আল্লাহ রাসূলকে সাঃ সৃষ্টি না করলে এই পৃথিবী সৃষ্টি করতেন না—এই কথা কতটুকু সঠিক ?
আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লামকে সৃষ্টি না করতেন, তাহলে এই সৃষ্টিজগৎ বা মাখলুকাত কিছুই সৃষ্টি করতেন না, এটি একেবারেই অমূলক ও বানানো একটি কথা। ড. আবদুল্লাহ জাহাংগীর রাহিমাহুল্লাহ তার “হাদীসের নামে জালিয়াতি” কিতাবে লিখেন,এ কথা যদি হাদিসের নামে বলা হয়, তাহলে এটি সবচেয়ে বড় জালিয়াতি। আর এ কথার সত্যিকার অর্থে কোনো ভিত্তিই নেই। এটি শুধু আবেগের কথা, যা মানুষের কাছে প্রচারিত হয়েছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআনের কোথাও এ কথা বলেন নি যে, এই পৃথিবীকে তিনি সৃষ্টি করেছেন মুহাম্মাদ সাঃ এর জন্য অথবা মুহাম্মাদ সাঃ কে সৃষ্টি না করলে তিনি কুল কায়েনাতের কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন না। এই ভ্রান্ত দাবীর পক্ষে কতিপয় জাল বর্ণনা সমাজে প্রচলিত আছে। যেমনঃ
.
১) আপনাকে সৃষ্টি না করলে বিশাল জগত সৃষ্টি করতাম না। [সাগানী, মাওযূআত, পৃষ্ঠা ৭] প্রসিদ্ধ হলেও বর্ণনাটি জাল ও ভিত্তিহীন। কোন হাদিস গ্রন্থে এর কোন অস্তিত্ব নেই। [শাওকানী, আল ফাওয়াইদুল মাজমূ’আহ ফিল আহাদীসিল মাওযূ’আ, পৃষ্ঠা ৩২৬]
২) ইবনু আব্বাস রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেনঃ একদা জিবরীল আঃ আমার কাছে আসলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ বলেছেনঃ হে মুহাম্মাদ, আপনাকে সৃষ্টি না করলে জান্নাত সৃষ্টি করতাম না এবং আপনাকে সৃষ্টি না করলে জাহান্নাম সৃষ্টি করতাম না। [দায়লামী, আল ফিরদাউস, ১/৪১ পৃষ্ঠা; আল আসারুল মারফূ’আহ ফিল আখবারিল মাওযূ’আহ ৪৪ পৃষ্ঠা] এটি একটি বাতিল বর্ণনা। একেবারেই উদ্ভট। [সিলসিলা যঈফা, হাদিস নং ২৮২]
৩) আপনাকে সৃষ্টি না করলে আমি দুনিয়া সৃষ্টি করতাম না। [ইবনু আসাকির; দায়লামী, আল ফিরদাউস, হাদিস নং ৮০৩১] এটিও মিথ্যা বা জাল বর্ণনা। [ইমাম সুয়ূত্বী, আল লাইলিল মাসনূ’আহ ফিল আহাদীসিল মাওযূ’আ, পৃষ্ঠা ২৪৯]
আরো একটি হাদীস দেখুন-
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যখন আদম (আঃ) অপরাধ করে ফেললেন, তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উসিলায় ক্ষমা চাচ্ছি যেন আপনি আমাকে ক্ষমা করেন। তখন আল্লাহ বললেন, হে আদম, তুমি কিভাবে মুহাম্মাদকে চিনতে পারলে, অথচ আমি তাঁকে এখনো সৃষ্টি করিনি? আদম (আঃ) তখন বললেন, হে আল্লাহ আপনি যখন আমাকে আপনার হাত দ্বারা সৃষ্টি করেন এবং আমার মাঝে আপনার পক্ষ থেকে রূহ ফুকে দেন তখন আমি মাথা তুলে দেখি যে, আরশের পায়ের সাথে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” লেখা আছে। তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তির নামই আপনার নামের সাথে যুক্ত করেছেন। তখন আল্লাহ বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ হে আদম, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আমার নিকট অধিকতর প্রিয়। তুমি তার উসিলায় আমার কাছে দোয়া কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব। আর মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে সৃষ্টি না করলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না। [মুস্তাদরাক হাকেম, হাদিস নং ৪২২৮]
এ হাদীসটি কুরআনে কারীমের বিপরীত। কারণ কুরআন দ্বারা প্রমাণিত যে, হযরত আদম আঃ কে আল্লাহ তাআলা কিছু বাক্য শিখিয়েছিলেন, যখন তিনি তা পড়েছেন, তখন আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করেছেন।
আল্লাহ তাআলার বাণী-
فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
অতঃপর হযরত আদম (আঃ) স্বীয় পালনকর্তার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর প্রতি (করুণাভরে) লক্ষ্য করলেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা-ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।
(সূরা বাকারাঃ ৩৭)
সেই শিখানো বাক্যটিও কুরআনে আল্লাহপাক উদ্ধৃত করেছেন-
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
তাহারা বলিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করিয়াছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইব।'
(সূরা আরাফঃ ২৩)
অথচ এ হাদীস দ্বারা বলা হচ্ছে যে, আদম আঃ রাসূল সাঃ এর ওসীলায় দুআ করেছেন, তারপর তার তওবা কবুল হয়, তাহলেতো এ হাদীসটি কুরআনের বিপরীত।
আল্লাহু সুবহানাহুতায়ালা মানুষ সৃষ্টির বিষয়ে সূরা আজ-জারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘জিন ও ইনসানকে আমি সৃষ্টি করেছি আমার ইবাদত করার জন্য।’ আল্লাহু রাব্বুল আলামিন আরো স্পষ্ট করেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে খলিফা প্রেরণ করব।’
আদম (আ.)-কে যখন সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহু রাব্বুল আলামিন সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন এটা প্রকাশ করলেন ফেরেশতাদের কাছে যে, ‘আমি আদমকে সৃষ্টি করছি। আমি পৃথিবীতে খলিফা প্রেরণ করছি।’ এভাবে আল্লাহু সুবহানাহুতায়ালা সৃষ্টির বিষয়গুলো স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এখানে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা নেই যে, আল্লাহু রাব্বুল আলামিন যে মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেছেন, বেহুদা-অনর্থক সৃষ্টি করেছেন—ব্যাপারটা এমন নয়। এর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, যা তিনি বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং তা নিজেদের আবিষ্কার করার কোনো দরকার নেই। নিজেদের গবেষণা করে বের করার কোনো প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তা মানুষের কল্যাণের জন্য। আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহর তৌহিদকে বাস্তবায়ন করার জন্য। সেটি আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহু রাব্বুল আলামিন কোথাও এ কথা বলেন নাই যে, এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছি মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য, অথবা মুহাম্মদ (সা.)-কে সৃষ্টি না করলে আমি কোনো কিছুই সৃষ্টি করতাম না। এগুলো আমরা নিজেরাই আবেগ দিয়ে তৈরি করে নিয়ে রাসুলের মিথ্যা আশেক হওয়ার জন্য রাসূল সাঃ এর ভালোবাসার মধ্যে সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন।
কোনো সন্দেহ নেই, রাসূলুল্লাহ সাঃ কে ভালোবাসা ইমানের দলিল, রাসূল সাঃ এর প্রতি ভালোবাসা আমাদের থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তির অন্তরের মধ্যে যদি রাসূলের সাঃ প্রতি ভালোবাসা না থাকে, তাহলে সে ইমানদার হতে পারবে না। কিন্তু যে কথা রাসূল সাঃ নিজেও বলেননি বা সাহাবারাও তাঁদের বক্তব্যে কোথাও বলেননি সেটা বানিয়ে বলতে হবে কেনো ?
@জামান

ফাতেমা রা. কে মা বলা কি ঠিক?

 May be an image of text that says 'ফাতেমা রা. কি আমাদের মা?'

 

প্রশ্ন: ফাতেমা রা. কে মা বলা কি ঠিক?
উত্তর:
◈ ফাতেমা রা. কে মা বলা ঠিক নয়। কেননা কুরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রীদেরকে মুমিনদের ‘মা’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন-যাদেরকে বলা হয় ‘উম্মাহাতুল মুমিনীন’। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
“আর তাঁর স্ত্রীগণ তাদের (মুমিনদের) মা।” (সূরা আহযাব: ৬)
সুতরাং যারা আমাদের মা তাদের কন্যাদেরকেও মা বলা কিভাবে সঙ্গত হতে পারে?
◈ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কন্যাগণ মুমিনদের মা হলে তো হারামের পর্যায়ে চলে যাবে। অথচ আলী (রা.), ওসমান (রা.) তাঁর মেয়েদেরকে বিয়ে করেছেন। যদি তাঁরা মা হতেন তাহলে এই উম্মতের কারো জন্য তাঁদেরকে বিয়ে করা বৈধ হতো না-যেমনটি বিয়ে করা হারাম ছিলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রীদেরকে।
◈ তাছাড়া ফাতিমা রা. কে কুরআন, হাদিস, সাহাবিদের বক্তব্য, তাবেঈনদের বক্তব্য, যুগে যুগে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এর অগণিত মুহাদ্দিস মুফাফসির কেউ মা বলে সম্বোধন করেছেন বলে ইতিহাস পাওয়া যায় না। কোনও হাদিসের কিতাব, সিরাতের কিতাব বা ইসলামের ইতিহাসের কিতাবে তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে বলে জানা নাই।
মূলত: রাসূল সাল্লাহু সাল্লাম এর কন্যা ফাতেমা রা. কে মা বলার প্রচলন শিয়াদের প্রভাবে এসেছে। সুতরাং তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
সুতরাং যারা যুক্তি দেখান যে, সম্মানের স্বার্থে ফাতেমা রা.কে ‘মা’ বলায় দোষ নেই। আমার দৃষ্টিতে এটি একটি খোঁড়া যুক্তি। এ দ্বারা মূলত: শিয়াদের দল ভারী করা হয়। আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমীন।
আল্লাহু আলাম।
—————–
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

 

 

যে ব্যাক্তি কাউকে অপমান করার ক্ষেত্রে তার [বৃহত্তর] জনগোষ্ঠীকেও সাব্যস্ত করে

 No photo description available.

 

আমরা বলি, "বরিশাইল্লারা খারাপ", "মানুষ দুই প্রকারঃ ভালো মানুষ আর নোয়াখাইল্লা", "কুমিল্লার লোক ইতর", "চাটগাঁইয়ারা নিজেদের দেশী লোক ছাড়া কিছু বুঝে না", "উত্তরবংগের লোক মফিজ" ইত্যাদি।
আর 'আইশা (রাঃ) এর বর্ণনা মতে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, "মিথ্যাবাদীদের মধ্যে নিকৃষ্টতম হচ্ছেঃ যে ব্যাক্তি কাউকে অপমান করার ক্ষেত্রে তার [বৃহত্তর] জনগোষ্ঠীকেও সাব্যস্ত করে, আর যে ব্যাক্তি তার পিতাকে অস্বীকার করে আর মাতার প্রতি ব্যাভিচারের [মিথ্যা] অপবাদ দেয়"। (সুনান ইবনে মাজাহ ৩৭৬১)
অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের দল/গোষ্ঠীকে সাব্যস্ত করা বিষয়গুলো অধিকাংশের ক্ষেত্রেই ঠিক না ভুল সেই প্রসংগেই যান নি। প্রথমেই একে মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আর দয়া করে লক্ষ্য করুন আর কোন ধরণের মিথ্যার সাথে একে এক কাতারে ফেলেছেন।
আমাদের একটু চিন্তা করা উচিত, আমরা যখন উপরের কথাগুলো বলি, তখন ভেবে দেখি কিনা যে বরিশাল নোয়াখালীর কোটি লোকের যদি একজনও ভালো হয়, চাটগাঁইয়া কোটি লোকের যদি একজনও সব নির্বিশেষে নিঃস্বার্থ উপকারী হয়, কুমিল্লার যদি একজনও ভদ্র হয় আর উত্তরবংগের যদি একজনও জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন হয়, তাহলে সামান্য মুখের সুখ করার জন্য সেই একজন একজন মানুষগুলোকে ঐ অপমানের মধ্যে ফেলার জন্য শেষ দিনের বিচারক আল্লাহ তায়া'লা যে হিসাব দিতে বলবেন, সেদিন সেই হিসাব দেওয়ার হ্যাডম আমাদের থাকবে কিনা।
আল্লাহ 'আজ্জা ওয়াজাল আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, সঠিক পথ দেখিয়ে দিন আর, শেষ বিচারের পরাজয় থেকে রক্ষা করুন, আমিন।
- আবদুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ
সূরা হুজুরাতের আয়াতটি খেয়াল করি - কে কোন অঞ্চল, কোন দেশ তা মোটেও বিবেচ্য নয়; মূল বিবেচ্য হলো 'তাকওয়া'।
“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে দল ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে (তোমাদের মধ্যে) সর্বাপেক্ষা ধার্মিক ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে অধিকতর সম্মানিত।” - সূরা হুজুরাতঃ ১৩
অর্থাৎ দল-গোত্রের পার্থক্য কেবলমাত্র পারস্পারিক পরিচয় লাভের জন্যেই করা হয়েছে; পরস্পরের হিংসা-দ্বেষ, গৌরব-অহংকার বা ঝগড়া বিবাদ করার উদ্দেশ্য নয়। এ বাহ্যিক পার্থক্য ও বিরোধের কারণে মানবতার মৌলিক ঐক্য ভুলে যাওয়া সংগত হবে না। তোমাদের পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য করার একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে নৈতিক চরিত্র, বাস্তব কার্যকলাপ এবং সততা ও পাপপ্রবণতা।
.
.
📝লেখা: Arafat

 

 

এক চাদরের ভেতর দুজন!

 May be an image of text that says 'পর্ব: ২৮ আমার ঘুম, আমার ইবাদাত আহমাদ সাব্বির'

 

এক চাদরের ভেতর দুজন!
ইসলামের একটা সৌন্দর্যের কথা আপনাদের বলি৷ ইসলাম তার অনুসারীদের অন্যায় থেকে বিরত থাকতে বলেছে৷ এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার সহায়ক হিসাবে ইসলাম তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছে যেন সে অপরাধের কাছেও না যায়৷ যেমন ধরা যাক একটা উত্তপ্ত অগ্নিগির৷ যার খাদে গিয়ে দাঁড়ালে আশঙ্কা আছে যে আপনি তাতে পড়ে যেতে পারেন৷ ইসলাম আপনাকে বলবে— দরকার নেই৷ তুমি বরং অগ্নিগিরির লাভা থেকে দূরেই থাকে৷ অযথা অ্যাডভেঞ্চারে ইসলাম উৎসাহ দেয় না৷ কারণ সেইটাই৷ যা বললাম মাত্র৷ এ ক্ষেত্রে ইসলামের দর্শন হলো— জীবন নাশের শঙ্কা থাকলে তা তুমি কেন করতে যাবে! বেঁচে থাকবে সকল শঙ্কা থেকে৷
এটাই ইসলামি বিধানের সৌন্দর্য৷ অপরাধ দমনে সে ছিদ্র ক্ষুদ্র থাকতেই বন্ধ করে দেয়৷ অপরাধের সূত্রপাত ঘটতে পারে এমন কাজ থেকেই ইসলাম আপনাকে বাঁধা দেবে৷ সেজন্যই ইসলাম বলছে—
তোমরা ব্যাভিচারের নিকটবর্তী হইও না৷
(আল কুরআন)
এ কথা ইসলামের কোনো অনুসারীর বলা শোভন হবে না— না, সমস্যা নেই৷ ব্যাভিচারের নিকটবর্তী হয়েও আমি ফিরে থাকতে পারব ব্যাভিচার থেকে৷ তবে এটা হবে রবের সাথে এক প্রকার ধৃষ্টতা৷ ইসলাম তাকে অপরাধের সকল সম্ভাব্য ক্ষেত্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বলে৷
তারই ধারাবাহিকতায় ইসলাম বলে যে— দুজন পুরুষ কিংবা দুজন নারী একই বিছানায় একই চাদর বা কাঁথা ইত্যাদির নিচে ঘুমোবে না৷
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
এক পুরুষ অন্য পুরুষের সাথে এবং এক নারী অন্য নারীর সাথে এক কাপড়ের ভেতর শোবে না।
(তিরমিযী)
আশা করছি আপনি বুঝতে পারছেন কেন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন৷
যদি বিকৃত যৌন মানসিকতার কারণে দুজন পুরুষ বা দুজন নারি একই চাদরের ভেতর শোয় তার নিষেধাজ্ঞা তো কুরআন-সুন্নাহর অন্যত্র আরও স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় করা হয়েছে৷
এই হাদীসের নিষেধাজ্ঞার আরও কিছু কারণ আছে৷
প্রথমত: দুজন পুরুষ বা দুজন নারী এক চাদরের ভেতর ঘুমোলে ঘুমের ঘোরে কারুর হাত কারুর স্পর্শকাতর যায়গায় চলে যেতে পারে৷ ঘুমন্ত ব্যক্তির হাতের ওপর যে তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না সে কথা তো আপনাদের আগেই জানিয়ে এসেছি৷ কারুর লজ্জাস্থান স্পর্শ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে গর্হিত অপরাধ৷
দ্বিতীয়ত: আপনার বন্ধুর সাথে এক চাদরের নিচে ঘুমোলেন৷ এরপর আপনার অনিচ্ছায় তার কোনো স্পর্শকাতর যায়গাতে আপনার হাত লেগে গেলো৷ কিন্তু আপনি জানেনও না এ ব্যাপারে কিছু৷ তবু আপনার বন্ধুর মনে আপনার প্রতি কি একটা বাজে ধারণা তৈরি হবে না! অথচ আপনি তেমন মানসিকতার নন৷
ইসলাম এই ভুল ধারণা সৃষ্টির হওয়ার পথটাই বন্ধ করে দিয়েছে৷ বলছে— উঁহু, এক চাদরের ভেতরে দুজন পুরুষ বা দুজন নারী ঘুমোনো চলবে না৷ তা তোমরা পরস্পরে যতোই 'বেস্ট ফ্রেন্ড' হও কিংবা হও পরস্পরের 'আত্মার বন্ধু'৷ কোনো অবস্থাতেই শরীয়তের বেঁধে দেয়া গণ্ডি অতিক্রম করা যাবে না৷ শরীয়তের সীমার বাইরে গেলেই দেখা দেবে বিপত্তি৷
আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের সঠিক উপলব্ধি কামনা করছি৷ তিনিই সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান৷

 

 

 

রাসূল সাঃ যেভাবে গোসল করতেন।

 

রাসূল সাঃ যেভাবে গোসল করতেন।
‌----------------------------------------------------
পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো গোসল।
আর যদি তা হয় রাসূল সাঃ এর শেখানো পদ্ধতিতে
তবে নিঃসন্দেহে তা হবে একটি ইবাদত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
🔹গোসল সাধারণত দুই ধরণের হতে পারে:
▪নূন্যতম বা জায়েয পদ্ধতি,
▪পরিপূর্ণ পদ্ধতি।
🔸জায়েজ পদ্ধতি হলো শুধুমাত্র ফরজ গুলো আদায় করা,সূন্নাত-মুস্তাহাব আদায় না করা।
🔸আর পরিপূর্ণ পদ্ধতি হলো যেভাবে রাসূল সাঃ বলেছেন, শিখিয়েছেন অর্থাৎ ফরজ, সূন্নাত ও মুস্তাহাব সহ আদায় করা এবং মাকরূহ গুলো বর্জন করে গোসল করা।
🔹গোসলের পদ্ধতি দুটি।
▪ফরজ গোসলের পদ্ধতি
▪সূন্নাত/গোসলের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি।
🔸 ফরজ গোসলের পদ্ধতি হলো-
প্রথমে উভয় হাত ধুয়ে নেবেন।
তারপর বাম হাতের উপর পানি ঢেলে দেহের নাপাকী ধুয়ে ফেলে বাম হাতকে মাটি অথবা সাবান দ্বারা ধুয়ে নেবে। এরপর (ফরজ হিসেবে) গড়গড়ার সাথে কুলি করবে,নাকের ভেতরের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে এরপর সমস্ত শরীরে পানি প্রবাহিত করবে। এতটুকু করলে ফরজ আদায় হয়ে যাবে এবং পবিত্রতা অর্জন হয়ে যাবে। (বুখারী-২৬০)
🔸সূন্নাত/পূর্নাঙ্গ পদ্ধতি হলো-
নবী সাঃ যেভাবে গোসল করতেন সেভাবে গোসল করাকে বলে সূন্নাত গোসল।
ওযু ও গোসলের সময় বিস্‌মিল্লাহ্‌ পড়া মুস্তাহাব।।কেউ কেউ ওয়াজিবও বলেছেন।
যে ব্যক্তি অপবিত্রতা থেকে গোসল করতে চায় তিনি তার হাতের কব্জিদ্বয় ধৌত করবেন। এরপর বাম হাতের উপর পানি ঢেলে দেহের নাপাকী ধুয়ে ফেলবেন। তারপর বাম হাতকে মাটি অথবা সাবান দ্বারা ধুয়ে নেবেন।
এরপর নামাযের জন্য ওযু করার মত পূর্ণ ওযু করবেন। যদি গোসলের যায়গাটি পবিত্র না হয় তবে গোসল শেষে পবিত্র জায়গায় গিয়ে উভয় পা ধুয়ে নেবেন।
কখনো রাসূল সাঃ আঙ্গুল দিয়ে মাথার চুলে খিলাল করতেন,(মুসলিম)। যদি কারো চুল ঘন হয় তাদের এটা করা উত্তম।
এরপর মাথার উপর তিনবার পানি ঢালবেন যাতে মাথায় চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছায়। এরপর শরীরের অবশিষ্টাংশ তিন বার ধৌত করবেন। প্রথমে ডান দিকে তিন বার এরপর বাম দিকে তিন বার পানি ঢালতেন।(বুখারী)। হযরত আয়েশা রাঃ বলেন- যতক্ষণ না তিনি নিশ্চিত হতেন যে তাঁর সম্পূর্ণ শরীরে পানি পৌঁছেছে ততক্ষণ তিনি পানি ঢালতেন। (বুখারী,মুসলিম,মিশকাত)
▪ নারী পুরুষের গোসলের পদ্ধতি একই। তবে নারী চুলের খোঁপা/বেনী না খুলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছালেই যথেষ্ট হবে তবে সম্পূর্ণ চুল ধোয়া উত্তম।( বুখারী,মিশকাত)
▪নখ পালিশ থাকলে তা তুলতে হবে, না হয় ফরজ গোসল আদাশ হবে না।
▪গোসলের পর নামাজের জন্য নতুন অযুর প্রয়োজন নেই। এতেই সালাত পড়তে পারবেন। (আবু দাউদ,তিরমিজি)
▪ সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গোসল করা যাবে না।
«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلَا يَدْخُلِ الحَمَّامَ بِغَيْرِ إِزَارٍ،
নাবী সাঃ বলেন- আল্লাহ তা’আলা ও পরকালের প্রতি যে লোক ঈমান রাখে সে যেন লুঙ্গি পরিহিত অবস্থা ছাড়া গোসলখানায় প্রবেশ না করে [তিরমিজী]।
▪গোসলের সময় পানি অপচয় করা যাবেনা। রাসূল সাঃ খুব অল্প পানি দিয়ে গোসল করতেন। (বুখারী)
كَانَ يَغْتَسِلُ ـ بِالصَّاعِ إِلَى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ، وَيَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ‏.‏
▪ হায়েস থেকে পবিত্র হওয়ার গোসলে রাসূল সাঃ বড়ই পাতা দিয়ে গোসল করতে বলতেন।
▪রাসূল সাঃ ও তাঁর স্ত্রীদের কেউ কেউ একই সাথে একই পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করেছেন। (বুখারী)

ইসলাম ও বিনোদন

 May be an image of text that says 'ইসলাম বিনোদন'

 

প্রশ্ন-১ঃ বিনোদনের ব্যাপারে ইসলামের কি অভিমত? ইসলাম কি আদৌ তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে?
উত্তরঃ ইসলাম চির সবুজ কল্যাণময়ী একটি জীবন বিধান। যা কিছু ধর্মীয় আচার-আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা মানুষের সামগ্রিক জীবনকে ব্যপ্ত করে আছে। ইসলাম মানব জীবনের মৌলিক ও অমৌলিক সব ধরনের চাহিদা পূরণ করেছে। মানুষের ছোটো ছোটো প্রয়োজনগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে তাকে একটি গতিশীল জীবনের দীক্ষা দিয়েছে। যা আনন্দ-ফূর্তি ও প্রাণের সজীবতায় উজ্জ্বল। ইসলামে নৈরাশ্যবাদ ও বৈরাগ্যবাদের কোন স্থান নেই। ইসলামে নৈরাশ্যবাদ ও বৈরাগ্যবাদের কোন স্থান নেই। ইসলাম নীরস কাঠখোট্টা জীবনকে প্রশ্রয় দেয় না। সে মানুষকে একটি প্রাণবন্ত মসৃণ জীবনের পথ দেখায়। যেখানে মানুষ প্রয়োজনীয় ও উপকারী বিনোদন রসের আমদানি করে জীবনকে আনন্দময় ও কর্মমুখর করে তুলতে পারে।
ক) বিনোদনের ইসলামী সংজ্ঞা ঃ
বিনোদন বলতে এমন কিছু ক্ষতিমুক্ত কর্মকান্ডকে বুঝায় যা কোন ব্যক্তি, দল বা শ্রেণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামী নিয়মনীতির উপর ভিত্তি করে আপন আপন সময়ে মানব মনের ভারসাম্যতাও একঘেয়েমীভাব কাটানোর জন্য পালন করে থাকে।
খ) বিনোদন জায়েজ হওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়তের দলিল ঃ
♻ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "তোমরা খেলাধুলা ও আনন্দ করো। কেননা আমি তোমাদের ধর্মে কঠোরতা অপছন্দ করি।" [কানযুল উম্মাল : ৪০৬১৬]
♻ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "কখনো কখনো মনকে আনন্দ দান করো।" [আহকামুল কুরআন ]
♻ আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, "আল্লাহর শপথ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার কক্ষের দরজায় দাড়ানো দেখেছি, যখন আবিসিনিয়ার লোকগণ আল্লাহর রাসূলের মসজিদে তাদের যুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে খেলছিলো। তিনি আমাকে তার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখছিলেন যাতে তাদের দিকে তাকাতে পারি। তারপর আমার জন্য আবস্থান করতেই থাকতেন যতক্ষণনা আমি নিজ থেকে ফিরে যেতে না চাইতাম।" [মুসলিম : ৮৯২]
♻ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, "তোমরা মনগুলোকে আনন্দ দাও, কেননা মন যখন বিরক্ত হয় তখন অন্ধ হয়ে যায়।" [বাহজাতুল মাজালিস, ইবনে আব্দুল বার]
♻ উমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "মুসলমান খেলাধুলা, তামাসা, হাসি ঠাট্টা করবে এটা দোষের ব্যাপার নয়। তবে এটা যেনো তার অভ্যাস চরিত্র ও প্রকৃতিতে পরিণত না হয়ে যায়। কারণ তখন সে কঠোরতার স্থানে ছাড় দেবে আর কাজের সময় বেহুদা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়বে।
প্রশ্ন-২ঃ শরীয়ত মোতাবেক ইসলামে বিনোদনের স্থায়ী নিয়মনীতিগুলো কি কি?
উত্তরঃ
১। বিনোদনের মূল হলো জায়েজ হওয়াঃ
এর প্রমাণ আবু দারদা (রাদিআল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, " আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছে তা হারাম। আর যে সমস্ত ব্যাপারে তিনি চুপ থেকেছেন তাতে রয়েছে ছাড়। সুতরাং তোমরা তাঁর ছাড় গ্রহণ কর। কেননা, আল্লাহ কোন কিছু ভোলেননা।" [মুস্তাদরাকে হাকেম : ২/৩৭৫]
২। বিনোদন হলো মাধ্যম, তা উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নয়ঃ
বিনোদন মানব জীবনের বিভিন্ন অংশের ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যম৷ কোন এক দিকের ভারসাম্যতা ক্ষুন্ন হলে বিনোদনের মাধ্যমে সে অংশের পরিপূর্ণতা লাভের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হয়। কিন্তু যদি এ সীমা লঙ্ঘন করা হয় এবং বিনোদনই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যে পরিণত হয়ে যায় তখন তার হুকুম মাকরুহ বা হারামে পরিণত হয়।
এর দ্বারা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, কোন কোন বিনোদন যখন পেশায় পরিণত হয় তখন তা হালাল বা বৈধতা থেকে হারাম বা মাকরুহের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
৩। বিনোদনমূলক কর্মকান্ডে অবশ্যই শরীয়ত বিরোধীতা বর্জন করতে হবেঃ
এ নীতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর কিছু নমুনা পেশ করা হলো ঃ
ক) এমন বিনোদন না করা যাতে অন্যের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ আছে, বা তাদের প্রতি ভয় প্রদর্শন করা হয়, বা কারো সম্পদ নষ্ট করা হয়।
খ) এমন বিনোদন না করা যাতে অপর মানুষের কথায় বা কাজে, শারিরীক বা আর্থিক অথবা মানসিকভাবে কষ্ট দেয়া হয়।
গ) এমন বিনোদন পরিত্যাগ করতে হবে যাতে মিথ্যাচার ও অপবাদ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ঐ লোকের ধ্বংস হোক যে ব্যক্তি লোক হাসানের জন্য মিথ্যা বলে, তার ধ্বংস হোক, তার ধ্বংস হোক।"
ঘ) এমন বিনোদন না করা যাতে খুব বেশি হাসতে হয়। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আর তোমরা বেশি বেশি হাসবেনা, কেননা তা মনকে মৃত্যু দেয়।"
ঙ) এমন বিনোদন যাতে না হয় যাতে গান-বাজনা রয়েছে৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক এমন হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী (সিল্ক), মদ ও গান বাদ্য হালাল করতে চাইবে।" [বুখারী : ৫৫৯০]
চ) এমন প্রতিযোগিতা না করা যাতে সরাসরি হারাম যন্ত্রপাতি (দাবা, হারাম গান-বাজনা ইত্যাদি) ব্যবহার করতে হয়।
ছ) বান্দার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কথা ও কাজ হবে আল্লাহর স্মরণ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিঃশর্ত আনুগত্যে ভরপুর। প্রবৃত্তির তাড়নায় সে কোন কাজ করতে পারে না। এই দৃষ্টি কোন থেকে ইসলাম যে শিল্প-সাহিত্য ও বিনোদন মানুষকে ধর্মের আনুগত্য থেকে বের করে বল্গাহীন জীবনের পথে ধাবিত করে তা থেকে বারণ করে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে। এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।" [সূরা লোকমান : ৬]
বর্তমানে আমরা বিনোদনের বড় দুইটা মধ্যম হিসেবে নি গান শোনা, মুভি, সিরিয়াল/নাটক ইত্যাদি দেখা৷ ইসলামে বিনোদনের সুযোগ দিলেও গান-বাদ্য, মুভি, নাটক দেখা কতটুকু জায়েজ?
প্রশ্ন-৩ঃ গান শোনা কি হারাম?
উত্তরঃ ইসলাম মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সুস্থতার স্বার্থেই গান-বাজনাকে নিষিদ্ধ করেছে। গান-বাজনা যেমন আমাদের পরকাল ভুলিয়ে দেয় তেমনি বাস্তুজগতকেও দেয় ডুবিয়ে। এ গানের মাধ্যমে দূর্বল নৈতিকতাসম্পন্ন লোকেরা বিশেষত তরুণ প্রজন্ম অবৈধ প্রেম ও লৌকিক ভালোবাসার প্রতি উদ্ধুদ্ধ হয়। গান-বাজনার ভূমিকা এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। যারা এ গান-বাজনায় পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাদের কাছে পবিত্র কুরআনের মোহনীয় তিলাওয়াত কিংবা হৃদয়ছোঁয়া সুর সুন্দর জীবনের প্রতি আহবানকারী ইসলামী নাশীদ ভালো লাগে না।
শায়খুল ইসলাম ইমাম আহমদ ইবনে তাইমিয়াাহ (রাহিমাহুল্লাহ) গান-বাজনার ব্যাপারে অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, "গায়ক বা গায়িকা যখন গান গায় তখন রোগগ্রস্ত অন্তর অশ্লীল মহব্বতের দিকে ধাবিত হয়। সেই সময় তার মনের অসুখ বৃদ্ধি পেয়ে তাকে বিপদগ্রস্ত করে তোলে। যদি তা থেকে মন পবিত্রও থাকে তবু গান-বাজনা মনকে অসুস্থ করে দেয়। এজন্য পূর্ববর্তী অনেক আলেম বলতেন, 'গান ব্যভিচারের মন্ত্র'। [মজমুয়াহ আল ফাতওয়া, ইবনে তাইমিয়া, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৩১৩]
➤ গান-বাজনা হারাম হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের দলীল ঃ
♻ আবু মালিক আল আশ'আরী (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মাদকদ্রব্য সেবন করবে এবং এর নাম পরিবর্তন করে অন্য কিছু রাখবে। তাদের মাথার উপরে বাজনা বাজানো হবে এবং গায়িকার গান পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা'আলা এদেরকে মাটিতে ধ্বসিয়ে দিবেন। [সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪৯৯ পৃষ্ঠা, ৩য় খন্ড]
♻ আবু উমামা (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, " আল্লাহ আমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত ও পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেনো গান-বাজনার যন্ত্রপাতি নিশ্চিহৃ করে দি। আর আমি যেনো দেবদেবীর মূর্তি, ক্রুশ এবং যাবতীয় অনৈসলামিক জিনিস বিলুপ্ত করে দিই। এসবের বেচা-কেনা শিক্ষা দেয়া অবৈধ। এসবের ব্যবসা করা যাবে না। এসবের মূল্য হারাম।" [মুসনাদে আহমদ, ২য় খন্ড, ১২৫ পৃষ্ঠা ]
♻ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিআল্লাহু আনহু) গানের প্রতিটি বাক্যকেই মাকরূহ মনে করতেন। তিনি বলতেন, "গান অন্তরে নিফাক (মুনাফেকি) সৃষ্টি করে, যেভাবে পানি ফসল উৎপাদন করে "।
♻ প্রখ্যাত তাবেয়ী শা'বী (রাহিমাহুল্লাহ) যারা গান শুনে এবং যারা গান গায় তাদের প্রত্যেককে অভিসম্পাত দিতেন। বলতেন, 'গায়ক, গায়িকা এবং শ্রোতা সবাইকে লা'নত। [তালবিস ইবলীস, ইবনে আল জাওমী]
প্রশ্ন-৪ঃ মুভি, সিরিয়াল ইত্যাদি দেখা কি জায়েজ?
উত্তরঃ নাটক, সিনেমা, সিরিয়াল, ভিডিও, ডকুমেন্টারী ইত্যাদি যেখানে হারাম ও অনৈতিক কার্যাবলী যেমন হারাম প্রেম-ভালোবাসার আবেগী প্রকাশ, হাত-ধরাধরি, নাচানাচি, লিভ-টুগেদার, অশ্লীল কথা ও বাদ্য বাজনা সংবলিত গান ইত্যাদি দেখা ও শোনা অবশ্যম্ভাবীভাবে হারাম। যে সমস্ত নাটক, মুভি এই সমস্ত হারাম বিষয়াদী থেকে মুক্ত সেগুলো দেখা জায়েজ।
মুসলিম ব্যক্তিসত্তা ও মুসলিম উম্মাহর উপর অশ্লীল নাটক, মুভি, সিরিয়ালের যে ঈমান বিধ্বংসী প্রভাবগুলো পড়ে তা হলো ঃ
১। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অবৈধ কামনা-বাসনার উদ্রেক।
২। মুসলিম সমাজে অনৈতিকতার প্রসার। এর অন্যতম কারণ এই মুভিগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি করা হয় এবং একে অত্যন্ত সহজলভ্য বানিয়ে দেয়া হয়েছে।
৩। Crime শিক্ষা দেয়, একে যুবক-বৃদ্ধ সকলের কাছে অত্যন্ত যুক্তিসংগত করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দি সিরয়ালগুলো পরকীয়া, পারিবারিক কলহ ও কুতনামীকে অত্যন্ত স্বাভাবিক, যুক্তিসংগত ও আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থাপন করছে।
৪। বিবাহিত জীবনে ভাংগন ও দাম্পত্য জীবনে অনৈতিকতার প্রবেশ। টিভিতে আকর্ষণীয় নারীদের দেখে স্বামীর কাছে স্ত্রীকে বা স্ত্রীর কাছে স্বামীকে অনাকর্ষনীয় ও নোংরা মনে হতে লাগে। ফলস্বরূপ একজন আরেকজনের প্রতি আকর্ষণ হারিয়্ব ফেলে এবং স্বাভাবিকভাবে পরকীয়ার সুত্রপাত ঘটে।
৫। বিভিন্ন কুফরি ও শিরকী মতবাদ, বিশ্বাস ও থিউরীর প্রসার, যেমন থিওরী অব ইভোলিউশন, ডারউননিজম, নাস্তিক্যবাদ, ফ্যান্টাসি ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক মুভিতে মানুষকে আল্লাহর ক্ষমতা ও গুণাবলী দান করা হয়, জাদুবিদ্যাকে প্রপোগেট করা, ধর্ম, ধর্মীয় পোশাক, আআচার-আচরণকে কটাক্ষ করা৷ (যেমন বাংলাদেশের বহুল আলোচিত মাটির ময়না ছবিটি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কটাক্ষ করে তৈরি করা।) ইত্যাদি।
৬। ক্রমাগত নাটক, মুভি দেখা মানুষেরা বাস্তবতা বিবর্জিত এক অবাস্তব ও মোহের জগতে বাস করে।
৭। হলিউড-বলিউড ইত্যাদি মুভিতে দেখানো নারীদের নগ্ন দেহ, অশ্লীল ও খোলামেলা দৃশ্যগুলো মুসলিম তরুণদের মাঝে প্রবল ফিতনার সৃষ্টি করছে। তরুণেরা এইসব নগ্ন দৃশ্য দেখার পর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিজেদের কামনা-বাসনে পুরণের জন্য অবৈধ পথ ও পন্থা খুঁজতে শুরু করে।
৮। নারীরা যখন টিভিটে আকর্ষণীয় নন-মাহরাম পুরুষদের এবং হারাম আবেগী সম্পর্কগুলো দেখতে থাকে তখন তাদের মন তাদেরকে হারাম সম্পর্কে উদ্ধুদ্ধ করে। তাছাড়া আকর্ষণীয় মুখাবয়ব ও ফিগারের নায়িকাদের তাদের রুপ-সৌন্দর্য, ফ্যাশন ইত্যাদি নিজেদের ভিতর ধারণ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে যা তাদের ফরজ পর্দা লংঘন করে বেপর্দা চলতে উৎসাহিত করে। [Source : The Evil Consequences of Watching Movies, Fatwa No 85232 : Islamic Question and Answer, Shaykh Muhammad Salih Al Munajjid]
চিত্ত বিনোদনের আর একটি জন্মপ্রিয় মাধ্যম আমাদের কাছে ইলেকট্রনিক বিভিন্ন গেইম। কিন্তু এই গেইমগুলো খেলা কতটুকু বৈধ?
প্রশ্ন-৫ঃ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গেইম নিজে খেলা কিংবা শিশুদেরকে খেলতে দেয়ার বিধান কি?
উত্তরঃ যে কেউ এ গেইমগুলোর প্রতি নজর দিলে দেখতে পাবেন যে, এ গেইমগুলো মানসিক দক্ষতা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।
এ গেইমগুলো নানা ধরণ ও প্রকৃতির হয়ে থাকে: কোন কোন গেইম আছে কল্পনিক যুদ্ধের; যে গেইমের মাধ্যমে একই ধরণের (বাস্তব) পরিস্থিতিতে কী করণীয় সে প্রশিক্ষণ রয়েছে। কোন কোন গেইমে থাকে– বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সতর্ক প্রস্তুতি, শত্রুর সাথে লড়াই, টার্গেটকে ধ্বংস করা, পরিকল্পনা তৈরী করা, দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা, গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া, হিংস্র জানোয়ার থেকে পলায়ন, বিমান চালানো প্রতিযোগিতা, গাড়ী বা অন্য যানবাহন চালানো প্রতিযোগিতা, নানা প্রতিবন্ধকতা থেকে উত্তরণ, গুপ্তধন অনুসন্ধান। কিছু কিছু গেইম আছে যেগুলো সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধি করে ও মনোযোগ বাড়ায়; যেমন- কিছু জিনিস খুলে সেগুলো অন্য কোথাও স্থাপন করা, বিচ্ছিন্ন ছবিগুলো একত্রিত করা, কোন কিছু নির্মাণ করা, রঙ করা, ভরাট করা ও লাইটিং করা।
শরয়ি বিধান:
ইসলাম বৈধ উপায়-উপকরণের মাধ্যমে চিত্ত বিনোদন ও বৈধ আনন্দ করতে বাধা দেয় না। এসব গেইমের মূলবিধান হচ্ছে- বৈধতা; যদি না এগুলো কোন ফরয আমল থেকে ব্যক্তিকে বিরত না রাখে; যেমন- নামায আদায়, পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং যদি না এগুলোতে হারাম কোন বিষয় না থাকে। অবশ্য এ ধরণের গেইমগুলোতে হারাম বিষয় কতই বেশি; যেমন-
- যে গেইমগুলোতে ভাল পক্ষ হিসেবে পৃথিবীবাসী ও দুষ্ট প্রতিপক্ষ হিসেবে আকাশবাসীর মাঝে যুদ্ধ চিত্রায়িত করা হয়। এর মধ্যে আল্লাহ্‌র প্রতি অপবাদ কিংবা সম্মানিত ফেরেশতাগণের প্রতি দোষারোপ এর দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
- যে গেইমগুলো ক্রুশকে পবিত্র বিবেচনা করার ভিত্তিতে নির্মিত। ক্রুশের উপর দিয়ে পথ অতিক্রম করলে স্বাস্থ্য ও শক্তি অর্জিত হয়, কিংবা আত্মা ফিরিয়ে দেয়া হয় কিংবা খেলোয়াড়ের আত্মার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হয় ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যে গেইমগুলোতে খ্রিস্টমাসের উৎসবের কার্ড ডিজাইন করা হয়।
- যে গেইমগুলোতে যাদুটোনার স্বীকৃতি প্রতি রয়েছে কিংবা যাদুকরকে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
- যে গেইমগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মিত। যেমন- এক গেইমে আছে মক্কার ওপর বোমা নিক্ষেপ করলে ১০০ পয়েন্ট, বাগদাদের উপর বোমা নিক্ষেপ করলে ৫০ পয়েন্ট।
- যে গেইমগুলোতে কাফেরদেরকে সম্মানিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদেরকে নিয়ে গর্ববোধ করার তালিম দেয়া হয়। যেমন এক গেইমে আছে খেলোয়াড় যদি কাফের রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নির্বাচন করে তাহলে সে শক্তিশালী হয়। আর যদি কোন আরব রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নির্বাচন করে তাহলে সে দুর্বল হয়। অনুরূপভাবে যেসব গেইমে শিশুদেরকে কাফেরদের স্পোর্টিং ক্লাব ও কাফের খেলোয়াড়দের দ্বারা অভিভুত হওয়ার তালিম দেয়া হয়।
- যেসব গেইমে নগ্ন চিত্রায়ন রয়েছে। কিছু কিছু গেইমে জয়ী হওয়ার পুরস্কার হচ্ছে- একটি নগ্ন ছবি। অনুরূপভাবে যেসব গেইমে চারিত্রিক ব্যুহকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। উদাহরণত যেসব গেইমের থিম হচ্ছে প্রেমিকা, প্রণয়িনী কিংবা বান্ধবীকে দুষ্ট লোকের হাত থেকে কিংবা ড্রাগনের হাত থেকে রক্ষা করা।
- যেসব গেইমের থিম হচ্ছে- লটারী ও জুয়া খেলা।
- যেসব গেইমে রয়েছে মিউজিক। ইসলামি শরিয়তে মিউজিক হারাম হওয়া সুবিদিত।
- এসব গেইম খেলায় রয়েছে শারীরিক ক্ষতি। যেমন, চোখের ক্ষতি কিংবা স্নায়ুর ক্ষতি। অনুরূপভাবে ক্ষতিকর সাউন্ড ইফেক্টের মাধ্যমে কানের ক্ষতি। আধুনিক গবেষণায় সাব্যস্ত হয়েছে যে, এ গেইমগুলো নেশাগ্রস্ত করে, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে, শিশুদের মাঝে উত্তেজনা ও স্নায়ুবিক চাপ সৃষ্টি করে।
- এসব গেইম সহিংসতা ও অপরাধ শিক্ষা দেয়। হত্যা ও প্রাণ বদ করাকে সহজ করে ফেলে। যেমনটি রয়েছে- প্রসিদ্ধ Doom নামক গেইমে।
- শিশুকে কল্পনার রাজ্য ও অসম্ভব কিছু করার তালিম দেয়ার মাধ্যমে শিশুর বাস্তবতার জ্ঞানকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন- মৃত্যুর পর আবার ফিরে আসা, অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা বাস্তবে যার অস্তিত্ব নেই, মহাকাশের বিভিন্ন জীব বা এলিয়েনের চিত্রায়ন ইত্যাদি।
আকিদা-বিশ্বাসের উপর এসব গেইমের ঝুঁকি ও শরয়ি বিধান লঙ্ঘনের উদাহরণ নিয়ে আমরা একটু দীর্ঘ আলোচনা করলাম। কারণ অনেক পিতামাতা এসব বিষয়ে সচেতন নয়। ফলে তারা তাদের সন্তানদের জন্য এগুলোর ব্যবস্থা করে দেন এবং এগুলোর মাধ্যমে তাদেরকে বিনোদন দিতে চান।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার সেটা হচ্ছে- এ গেইমগুলো খেলার ক্ষেত্রে বিনিময় নিয়ে প্রতিযোগিতা করা নাজায়েয; এমনকি সে গেইমটি খেলা জায়েয হলেও। কেননা এসব গেইম জিহাদের উপকরণ নয়। এগুলো খেলার মাধ্যমে কেউ জিহাদ করার শক্তিও অর্জন করবে না।
[সূত্র: ড. সাদ আল-শাছরি লিখিত ‘আল-মুসাবাকাত ওয়া আহকামুহা ফিস শারিয়াতিল ইসলামিয়্যা’]
➤ বর্তমান অবস্থায় সচেতন বিবেকের দাবীঃ
মানবজীবনে জাহেলী রীতি-নীতি তখনই অবাধে বিস্তার লাভের সুযোগ পায় যখন সুস্থ চর্চা রুদ্ধ বা বন্ধ হয়ে যায়। হারাম বিনোদনের উপকরণ ও পথভ্রাষ্টতা থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের এই মুহুর্তে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
১। ইসলামী সাংস্কৃতির আন্দোলনকে জোরদার করে এ ব্যাপারে ব্যপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
২। সংগীত, সাহিত্য, চলচিত্র, কাব্যচর্চা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র ইসলামী ধারা সৃষ্টি করতে হবে এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে তাকওয়া ও স্ব স্ব ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করা যেতে পারে।
৩। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও World Class quality সম্পন্ন চলচ্চিত্র তৈরির যোগ্যোতাসম্পন্ন ইসলামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা। মনে রাখতে হবে, চলচ্চিত্র একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ জাতিসত্তা ও স্বাতন্ত্র্যবোধকে প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে। তাই আমাদের এমন প্রশিক্ষিত ও তাকওয়াসম্পন্ন পপরিচালক প্রয়োজন যারা মুসলিম জাতির ঈমান, আকীদা, ইতিহাস, স্বাতন্ত্র্যবোধ ইত্যাদিকে চলচ্চিত্রের পূর্ণাঙ্গরুপে ফুটিয়ে তোলার যোগ্যতা রাখবেন এবং এই চলচ্চিত্রগুলোর আধুনিক প্রজন্মকে আকর্ষণ করার সক্ষমতা থাকবে।
৪। সর্বোপরি মেধাবী মুসলিম তরুণদের বিনোদন জগতে একটি স্বতন্ত্র ইসলামী ধারা তৈরির দৃঢ় আকাঙ্খা ও ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে আশাটা সময়ের সুদৃঢ় দাবী।
তথ্যসূত্রঃ
১। ইসলাম ও বিনোদন, ডঃ আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া।
২। আসুন গান-বাজনা থেকে তওবা করি, লেখক ঃ আলী হাসান মুহাম্মদ।
৩। ইসলামের দৃষ্টিতে গান-বাজনা, লেখকঃ মুহাম্মদ খলীলুর রহমান, প্রকাশকঃ গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার।
৪। Islamic Question and Answer, Shaykh Muhammad Salih Al Munajjid
||ইসলাম ও বিনোদন||
~ জেবা ফারিহা

 

 

 

 

নাম নিয়ে কথা

 আজকাল বিভিন্ন ইসলামিক নাম আমাদের হাসি তামাশার খোরাক হয়ে উঠেছে। একজন মুসলিম হয়ে ও অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে এই গোনাহর কাজ করেই চলেছি।
আসুন দেখি এর কিছু উদাহরণ
মোখলেস:
টিভিরেডিওতে প্রাণ ম্যাঙ্গো ক্যান্ডির এই নামটিকে ফান হিসেবে দেখা হয়। এমনকি যাদের নাম মোখলেস তারাও এই নাম নিয়ে বেশ বিপদে পড়তে হয়। আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি এর নামের অর্থ কি? মোখলেস নামটি আরবি এখলাস শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ একনিষ্ঠভাবে এবাদত করা।আল্লাহর নিকট ইখলাস ছাড়া কোন আমলই গ্রহণযোগ্য নয় আর সেই নামকেই আমরা ফান বানিয়েছি?
মফিস :
এটি একটি আরবি নাম যার অর্থ সফলকাম হওয়া। সাধারণত পরকালের সফলতা বুঝাইতেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা কে না চাই পরকালে সফল হতে? তবে কেন ম্যাজিক টুথ পাউডারের কল্যাণে এই নাম নিয়ে ঠাট্টা করি। পরকালের সফলতা নিয়ে যদি ঠাট্টা করি তবে কি আসলেই আমরা পরকালে সফল হতে পারবো?
আবুল :
এই নাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি ফান করা হয়।আমরা কি এই নামের মাহাত্ম্য জানি? আমাদের নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপনাম আবুল কাসেম। যার অর্থ হল "কাশেমের পিতা " ভাবুন কি নিয়ে ফাজলামি করছি। যেখানে তার নামকে সম্মান করা দরকার ছিলো সেখানে আমরা তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ করছি। আফসোস।
কুদ্দুস
সর্বাধিক ফান করা হয় এই নামটি নিয়ে। অথচ আল্লাহর একটি গুনবাচক নাম যার অর্থ "মহাপবিত্র " কেউ যদি কাউকে শুধু কুদ্দুস বলে তবে তার পাপ হবে। কারণ এটি সিফাতী নাৃ বলতে হবে আব্দুল কুদ্দুস। চিন্তা করে দেখুন আমরা আল্লাহর নাম নিয়েও রসিকতা করছি। আমাদের ঈমানের অবস্থা কেমন?
মমিন
আসলে এর শুদ্ধ উচ্চারণ হবে মুমিন। একজন পূর্ণাঙ্গ ঈমানদারকেই মুমিন বলে। কিন্তু দেখুন ফেসবুকসহ বিভিন্ন স্থানে "কস কি মমিন " বলে নামটিকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে এবার বলুন আর কি নিয়ে আমাদের ফান করা বাকি আছে?আমরা কি একটু সচেতন হতে পারি না?
আর সবশেষে,
কুরআন মাজীদে একটি আয়াত দিয়ে শেষ করতে চাই,
তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না, কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তাওবা না করে তারাই জালেম (সূরা হুজরাত আয়াত ১১)
আল্লাহ আমাদের সহি বুজ দান করুন।

আমার_ঘুম_আমার_ইবাদাত

 May be an image of text that says 'আমার ঘুম আমার ইবাদাত প্রথম গর্র আহমাদ সাব্বির'

 

একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন— প্রতিদিন যদি আমরা আট ঘন্টা করেও ঘুমাই তবে এর অর্থ হবে আমাদের জীবনের এক তৃতীয়াংশ ঘুমের মধ্যেই অতিবাহিত হয়ে যায়৷ যদিও ঘুম মৃত্যুর মতোই৷ ঘুমের ঘোরে চোখ বন্ধ করে থাকি যখন আমরা দুনিয়া থেকে বেখবর হয়ে যাই৷ তবু, জীবদ্দশায় আমাদের ঘুম এটা তো আমার জীবনেরই অংশ৷ আল্লাহ তায়ালা যে কেয়ামতের দিন আমার জীবনের হিসাব নিবেন তখন কি এই দৈনন্দিন আট ঘন্টা ঘুমিয়ে কাটালাম তার হিসাব চাইবেন না! অবশ্যই চাইবেন৷ জীবনের প্রতিটি প্রশ্বাসের, প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব তিনি চাইবেন৷
প্রখ্যাত সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল একদিন বলছেন আবু মুসা আশয়ারি রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে— আমি তো আমার ঘুম থেকেও সওয়াবের আশা রাখি৷ যেমন সওয়াবের প্রত্যাশা করি আমার নামাজ, আমার রোজা ও আমার তাবৎ ইবাদাত থেকে৷
(আসসালাতু ওয়াত তাহাজ্জুদ)
সুবহানাল্লাহ৷ আমরা তো মনে করি আমাদের ঘুম কেবল শরীরের ক্লান্তি নিবারক৷ দিনের যত শ্রান্তি তা দূর করবার জন্যে আমি বিছানার বুকে এলিয়ে দিই আমার দেহ৷ ঘুম আমার কাছে কেবলই একটা মেডিসিনের মতো: যা আমার শরীরে এনার্জি ফিরিয়ে দেয়৷
কিন্তু সাবাহায়ে কেরাম দেখেন ঘুমকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতেন৷ তাদের কাছে ঘুম কেবলই ক্লান্তি নিবারক নয়৷ সেটা তো আছেই৷ ঘুম তো ক্লান্তি দূর করবেই৷ “আর আমি নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি নিবারণকারী” (সূরা নাবা) কিন্তু তারা এটাকে ইবাদাতও মনে করতেন৷
কেন?
কিভাবে তাঁরা ঘুমের মতোন একটা আবশ্যিক মানবিক কাজকে ইবাদাত ভাবছেন! তাঁরা ভাবতে পারছেন— কারণ তাঁদের ঘুমটাও যে ছিল কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী৷ তাঁদের সামনে ছিল নবিজীর ঘুমের চিত্র৷ তাঁরা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ঘুমের বেলাতে এসেও ফলো করতেন নবিজীকে৷ এবং পূর্ণ মাত্রায়৷ তাই তাঁরা বলতে পেরেছেন— আমাদের ঘুম আমাদের ইবাদাত৷ বিনিময়ে তাঁরা হয়ে উঠেছেন মুমিনের আইডল৷ ইমান পরিমাপের মাপকাঠি৷
তোমরা ইমান আনো যেমন ইমান এনেছে মানুষেরা (সাহাবায়ে কেরাম)
(সুরা বাকারা)
এখন আমাদের ঘুমকে ইবাদাতের অংশ করবার জন্যে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে ঘুমোতেন৷ ঘুমোবার পূর্বে আরও কি কি প্রাসঙ্গিক কাজ করতেন৷ এবং এটাও আমাদের জন্যে জেনে নেয়া প্রয়োজন— ঘুম থেকে জেগেই বা নবিজী কী করতেন!
এসব কিছু জেনে নিজেদের জীবনে যদি তার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারি তবে আমার হৃদয়ও আমাকে বলবে— তোমার ঘুম থেকে তুমি সওয়াবের আশা করতে পারো৷
ক্রমশ...

 

 

 

জাদুটোনা শয়তানের কুপ্রভাব থেকে বাঁচার উপায়

 May be an image of text that says 'জাদুটোনা শেয়তানের বেঁচে থাকার শ থেকে'

 জাদুটোনা শয়তানের কুপ্রভাব থেকে বাঁচার উপায়

 

আমাদের প্রতিবেশী এক নানু আম্মুর কাছে খুব আক্ষেপ করছিলেন উনার মেয়েদের বিয়ে শত্রুপক্ষ বারবার কুফরি করে আটকে রাখা নিয়ে।
অনলাইনে পরিচিত এক বোনের সাংসারিক জীবনের করুণ কাহিনী জানি। দুশ্চারিত্রা শাশুড়ির কুফরি কালামের আশ্রয়ে জাদুর বলয়ে বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার অবস্থায় পৌছিয়েছে।
এমন ঘটনা খুজে দেখলে অনেক পাওয়া যাবে।
ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কুফুরি কালাম বা জাদু টোনা এখন খুব কমন একটি প্র্যাকটিস বলা চলে। টিভি, পেপার, রাস্তায় রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে এদিকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
 আর আমরা জানি নাওয়াক্বিদুল ঈমান তথা ঈমান ভঙ্গের ১০টি কারণের মাঝে একটি হল জাদু করা ও জাদুকরের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়া।
এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 
‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাক। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ঐ ধ্বংসাত্মক জিনিসগুলো কি? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সাথে শিরক করা (২) যাদু করা (৩) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন (৪) সূদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা (৬) যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা (৭) সতী-সাধ্বী মুমিন মহিলাকে অপবাদ দেয়া’।[বুখারী হা/২৭৬৬; মুসলিম হা/২৭২; মিশকাত হা/৫২।]
 
আর এটি কোন কল্পকাহিনী নয়। কুফুরি কালামের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করা, আত্মীয়ের ছেলে বা মেয়ের বিয়ে আটকিয়ে রাখা, পড়াশোনা, ব্যবসা, চাকরি ইত্যাদির ক্ষতি করা, কাউকে মানসিক ভারসাম্যহীন করে ফেলা, এমনকি এক্সট্রিম পর্যায়ের কুফুরি কালাম করে মানুষকে মেরে ফেলা পর্যন্ত সম্ভব।
আর এগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কেউ যাদুকরের কাছে গেলে তারও ঈমান চলে যাবে। একসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা কুরআনে হুশিয়ারি করে বলেন, ‘তারা ভালরূপেই জানে যে, যে কেউ যাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই’ (বাক্বারাহ ১০২)।
সুন্নতি লিবাসে প্রচুর শয়তান আজ এসবের সাথে জড়িত। আত্মীয়স্বজনের মাঝে বা পরিচিতদের অনেকেই কারো ভালো দেখতে না পেরে হিংসায় এগুলো করে থাকে। অথচ এই জাহেল মানুষগুলো বুঝে না এর মাধ্যমে তারা ইসলাম থেকেই বের হয়ে যায়। তাদের পূর্বের সকল আমল বরবাদ হয়ে যায়। এগুলো নিজেকে করা লাগে না, টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষরুপী জানোয়ারের মাধ্যমে এগুলো খুব সহজেই করা যায় এবং আমাদের চারপাশের হাজার হাজার লোকজন এগুলো করছে। এবং এর ফলাফল হয় খুব ভয়াবহ। কেননা এইসব কুফুরি কালামের প্রভাব কার্যকরী। ক্রমাগত জঘন্য সব কুফুরি আর শির্ক করার মাধ্যমে শয়তানকে খুশি করা হয় আর শয়তান এসে তাদের কাজ করে দেয়। যারা জানেন না এগুলো কীভাবে করে, না জানাই ভালো। কেননা এগুলো জানা কোন জরুরী বিষয় নয়, জরুরী বিষয় হল এগুলো থেকে কীভাবে বেঁচে থাকবেন।
স্বয়ং রসুলুল্লাহ(ﷺ) কে কুফুরি কালাম করা হয়েছিল এবং উনার উপর এর প্রভাব কার্যকর করে আল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছেন তা সত্য এবং আমাদের বেলায়ও তা হবে। এবং মৃত্যু পর্যন্ত উনার উপর এর কিছুটা প্রভাব ছিল বলে অনেক আলিম বলেছেন। এরই প্রেক্ষিতে সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস নাযিল হয়। যারা বলেন তাহলে তো গণতন্ত্রের মানসকন্যা ও গোলাপি আন্টি একজন আরেকজনকে এভাবে ধ্বংস করে দিতো, পারছে না কেন? তাদের জানা উচিত এইসব নেতারা কুফুরি কালামের মাধ্যমে বহু আগে থেকেই নিজেদেরকে প্রটেকশান দিয়ে রেখেছে। শুধু এই উপমহাদেশ নয় বরং ইউরোপ আমেরিকার নেতারাও প্রতিপক্ষের হাত থেকে বাঁচার জন্য এগুলোতে অভ্যস্থ। যারা এগুলো নিয়ে ঘেঁটেছেন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন।
আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, الوقایة خیرمن العلاج অর্থাৎ প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ উত্তমতাই জাদু শয়তান ও জ্বিনের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগেই সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।
প্রতিরোধের উপায়ঃ
১) আকীদা বিশুদ্ধ করুন।
প্রত্যেক মুসলমানের উচিত তার আকিদা বিশুদ্ধ করা। সে দৃড়ভাবে বিশ্বাস করবে যে, যা কিছু হয় সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। মুসীবত, কষ্ট, যন্ত্রণা সবই আল্লাহর হুকুমে হয়। আল্লাহর ইচ্ছা না থাকলে কোন কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না। না জাদুটোনা, না জ্বিন-শয়তান, না কোন সুপার পাওয়ার দাবিদার কেউ।
আল্লাহ তা'আলা বলেছে, "আর তারা (জাদুকরেরা) আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন ক্ষতি করতে পারে না।" [সূরা বাকারা : ১০২]
যেহেতু আল্লাহর ইরাদা ও ইচ্ছা ব্যতীত কোন কিছু হয় না। তাই সুস্থতা-অসুস্থতা, বিপদ-আপদে সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসায় কল্যাণকর।
 
২) তাকওয়া অর্জন করা।
সমস্ত কাজে আল্লাহর হুকুমকে সর্বাগ্রে এবং সব নিষেধ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। যে তাকওয়া অর্জন করে আল্লাহ তাকে সব রকম বিপদাপদ ও কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ বলেছেন- "যে তাকওয়া অর্জন করবে, আল্লাহ তাকে (বিপদাপদ ও পেরেশানি থেকে) বের হবার রাস্তা করে দেবেন।" [সূরা তালাক : ২]
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, "তোমরা যদি সবর ও তাকওয়া গ্রহণ করো, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।" [সূরা আল ইমরান : ১১০]
 
৩) আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখুন।
সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। যে বান্দা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করেন আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহ বলেছেন, "যে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।" [সূরা তালাক : ৩]
 
৪) ইস্তি'আযাহ করুন।
জাদু ও জাদুর প্রভাবে সবচে বেশি ভূমিকা রাখে জ্বিন ও শয়তান। বেশির ভাগ সময় তাদের মাধ্যমে জাদু করা হয়। তাই জ্বিন ও শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়াকে 'ইস্তি'আযাহ' বলে। তাই ইস্তি'আযার আয়াত, দু'আ ও যিকির-আযকারকে দৈনন্দিন আমল বানিয়ে নিন।
যেমন বেশি বেশি এ আয়াত পড়ুন-
رب اعوذ بک من ھمزت الشيطين - واعوذ بک رب ان يحضرون
‘হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি শয়তানের প্ররোচনা থেকে।
আর হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে।’ [সূরা মু'মিনুন : ৯৭-৯৮]
৫) আজওয়া খেজুর খান।
সসম্ভব হলে জাদুর কুপ্রভাব থেকে বাঁচার জন্য আজওয়া খেজুর খান।
সা‘দ (রাযি.) তাঁর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রত্যেকদিন সকালবেলায় সাতটি আজওয়া উৎকৃষ্ট খেজুর খাবে, সেদিন কোন বিষ ও যাদু তার ক্ষতি করবে না। [সহীহ বুখারী, ৫৪৪৫]
 
৬) সকাল-সন্ধ্যার আমল করুন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে দু'আগুলো সকাল-সন্ধ্যায় শিখিয়েছেন, তা গুরুত্বের সাথে পাঠ করুন।
যেমন-
 
ক. প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে ও ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পড়া। একটি হাদীসে এসেছে, "যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পড়বে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে একজ ফেরেস্তা নিযুক্ত করা হবে, সে সারারাত পাঠকারী বান্দাকে পাহারা দেয়। শয়তানকে তার কাছে ঘেষতে দেয় না।" [সহীহ বুখারী, ২৩১১]
 
খ. ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত দ্বারাও শয়তান ও জাদু থেকে হিফাজতে থাকা যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়।" [সহীহ মুসলিম, ৭৮০]
 
গ. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত রাতের বেলা পাঠ করাও গুরুত্বপূর্ণ। তা মানুষকে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, এই দুই আয়াত তার জন্য যথেষ্ট হবে।" [সহীহ মুসলিম, ৮০৭]
 
ঘ. সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস বেশি বেশি পড়তে থাকা। বিশেষ করে প্রত্যেক সালাতের পর একবার করে এবং ফজর ও মাগরিবের পরে প্রত্যেক সূরা তিনবার তিনবার করে পড়লে দুনিয়ার সবকিছুর জন্য যথেষ্ট হবে।
 
ঙ. সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার নিচের দু'আটি পড়লে দুনিয়ার কোন কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। দু'আটি হলো,
«بسم الله الذي لا يضر مع اسمه شيء في الازض ولا في السماء وھو السميع العليم».
“আল্লাহ্‌র নামে; যাঁর নামের সাথে আসমান ও যমীনে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।”[ আবূ দাউদ, ৪/৩২৩, নং ৫০৮৮; তিরমিযী, ৫/৪৬৫, নং ৩৩৮৮; ইবন মাজাহ, নং ৩৮৬৯; আহমাদ, নং ৪৪৬।]
 
৭) মানুষের সাথে শত্রুতা থাকলে তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। 
 
আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাদের সকলকে হিফাজত করুন।
||জাদুটোনা (শয়তানের কুপ্রভাব) থেকে বেঁচে থাকার উপায়||
~ জেবা ফারিহা