Tuesday, July 27, 2021

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট: আমার কিছু ভাবনা

 

কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে অহরহ একটি বিষয় লক্ষ করছি। তাই এটা নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে কিছু লিখার প্রয়োজন মনে করলাম।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট -১
কয়েকদিন ধরে চেনা-অচেনা অনেকেই ইনবক্সে একটি মেসেজ দিচ্ছেন। সেটা হচ্ছে একটি অ্যাপকে রেফার করা। আর সেই অ্যাপটি হচ্ছে সকলের সুপরিচিত ‘টিকটক’। আমরা দৈনন্দিন প্রয়োজনে বিভিন্ন অ্যাপ রেফার করে থাকি। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ আমাদের সর্বদাই কাজে লাগে। কিন্তু এই টিকটক কি আসলেই নিত্যকার প্রয়োজনীয়?
টিকটকের কার্যক্রম কিরকম আর এই অ্যাপ কি নিয়ে কাজ করে সেটা কারোরই অজানা নয়। তাই এ নিয়ে আজ কিছু লিখতে চাই না। যুবসমাজের ধ্বংসের মূল একটি হাতিয়ার বললেও মনে হয় খুব বেশি ভুল হবে না। আর এই অ্যাপ প্রমোট করা, রেফার করা একজন মুসলিমের জন্য কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটাই ভাবার বিষয়।
কয়েকদিন ধরে যেটা লক্ষ করছি সেটা হচ্ছে যারা কোনদিন টিকটক ব্যবহার করেননি বা কোনভাবেই এর সাথে যুক্ত ছিলেন না তারাও এর রেফারেল মেসেজ দিচ্ছেন। কেন? কারণ একটি রেফার করলেই কিছু টাকা দিচ্ছে অথোরিটি। এরকম কয়েকটি রেফার করতে পারলেই হাতিয়ে নেওয়া যাবে হাজার দুয়েক টাকা। এতে অথোরিটির লাভ কি? সহজ উত্তর, এতে তাদের অ্যাপের প্রচার হচ্ছে যার ফলে তাদের ইনকাম সোর্স বাড়ছে আর সেখান থেকেই কিছু অংশ রেফারকারীকে দিচ্ছে তারা।
অনেকেই ভাবছেন, বাহ! সহজ তো। অল্প কষ্টে অধিক টাকা, তাও আবার বসে থেকেই।
থামুন!! একজন মুসলিম হিসেবে আপনার উচিৎ নয় যেখানে সেখানে আয়ের উৎস খোঁজা। একজন বিবেকবান মানুষ যেমন ডাস্টবিন থেকে পঁচা খাবার তুলে খাবে না, যতই সুস্বাদু হোক, তেমনি একজন মুসলিমও যেখানে সেখানে আয়ের উৎস খুজতে পারে না, যতই লাভজনক হোক।
কিন্তু আপনি বলতে পারেন, সমস্যা কি? আমি তো আর ভিডিও দেখছি না বা তৈরি করছি না। এবার আমি বলি, আপনি কিছু টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তত ১০ জনকে রেফার করছেন। এই ১০ জনের কেউই যে তাদের ভিডিও দেখবে না বা তৈরি করবে না তার কি গ্যারান্টি? আবার এই ১০ জন অন্য যাদের রেফার করবে তারা যে দেখবে না তার কি গ্যারান্টি? এতে তাদের সমপরিমাণ গুনাহ আপনার আমলনামায় যোগ হবে। আর এটা প্রজন্মের মতো চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকবে।
এখন আপনি তো আবার আল্ট্রা প্রো-ম্যাক্স বুদ্ধি নিয়ে চলেন। আপনি হয়তো বলতে পারেন আমি তো অন্য কাউকে রেফার করি না, আমি নিজেই ১০ টা একাউন্ট খুলে সেটাতে রেফারেল কোড ব্যবহার করছি। পরে আবার ডিলেট করে দিব। এক্ষেত্রে বুঝা যায় আপনার উদ্দেশ্য ভিডিও দেখা না, শুধু কিছু টাকা কামানো। এতে সমস্যা কি? এতেও সমস্যা আছে। কারণ তাদের যে আয়ের উৎস সেটা কিন্তু হারাম। অন্যরা তাদের অ্যাপ ব্যবহার করছে আর এতে তারা লাভবান হচ্ছে, আর সেখান থেকেই কিছু অংশ আপনাকে দিচ্ছে। এটা স্পষ্টত যে তাদের উৎস হারাম আর সেখান থেকেই আপনাকে টাকা দিচ্ছে।
একজন সুদখোরের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া একজন মুসলিমের জন্য জায়েজ নয়, কারণ তার আয়ের উৎস হারাম (ভিন্ন কোন উৎস থাকলে আলাদা ব্যাপার)। তাহলে যার একমাত্র আয়ের উৎস হারাম তার থেকে আপনি টাকা নিবেন কোন যুক্তিতে? সে তো আর অন্য কোন সোর্স থেকে আপনাকে টাকা দিবে না। একটি প্রশ্ন, এই সামান্য ক-টি টাকা না হলে কি আপনার বিরাট কোন লোকসান হবে, পরিবারের কেউ না খেয়ে মারা যাবে? তাহলে হারামে পা বাড়াচ্ছেন কেন?
এখন টাকা তুলেই ফেলেছেন, তাহলে করণীয় কি? টাকা তুললে আপনি সেই টাকা সাওয়াবের নিয়ত ব্যাতিত দান করে দিন। পাপে জড়ানোর কারণে তওবা করে নিন (নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমা করতে ভালবাসেন)। আর যাদেরকে আপনি রেফার করেছেন তাদের হাতে পায়ে ধরে হলেও বলুন তারা যেন ডিলেট করে দেয়। কারণ তওবা করেও কোন লাভ হবে না যদি এর মাধ্যমে তারা ফায়দা নিয়ে থাকে। এতে আপনার আমলনামায় চক্রবৃদ্ধি হারে গুনাহ আসতেই থাকবে।
|| সমসাময়িক প্রেক্ষাপট: আমার কিছু ভাবনা||
“হাসান তারিক”

তারবিয়্যাহ—সঠিক প্রশিক্ষণ

| তারবিয়্যাহ—সঠিক প্রশিক্ষণ |
 
ইসলাম পুরোটাই চর্চার বিষয়। ইসলামে নন-প্র্যাক্টিসিং বলে কোনো কথা নেই। মুসলিম মানেই তো ইসলাম অনুযায়ী জীবনযাপনকারী। যে ইসলাম সম্পর্কে জেনেও মানে না, সে আবার কেমন মুসলিম! তাই ইসলামে তারবিয়্যাহ এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজকে প্রভাবিত করতে পারবে, এমন নীতিমান নাগরিক গড়ে তুলতে হলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আচার-আচরণের সুষ্ঠু রীতিনীতি থাকা অপরিহার্য। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ছোট-বড় যত ধরনের সামাজিক সমস্যা আছে, তার সবগুলোর মূলে রয়েছে তারবিয়্যাতের অভাব। 
 
বর্তমানে আমরা উন্মাদের মতো বস্তুগত উন্নতির পিছনে ছুটছি। সন্তান প্রতিপালনের জন্য আমরা জাদুকরি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির তালাশে আছি, যেন আমাদের নিজেদের সময় ও শক্তি খরচ করতে না হয়। এর ফলে আমাদের সন্তানরা বড় হয়ে অযত্নশীল ও স্বার্থপর হবে—এটাই তো স্বাভাবিক। পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা খরচ করলেই এইসব সমস্যা সমাধান হয়ে যায় না। কথায় আছে, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। সন্তানদের যেভাবে বড় করে তুলব, তার উপর নির্ভর করবে আমাদের সমাজ, জীবন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সন্তানদের বিলাসিতার মধ্য দিয়ে বড় করার অর্থ হচ্ছে নিজেদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত করা। আর পার্থিব ভবিষ্যৎ তথা পরনির্ভরশীল বার্ধক্যের দুর্ভোগ তো আছেই। সন্তানকে শুধু টাকা দিলেই হয় না, সময় এবং মনোযোগও দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। 
 
তারবিয়্যাতের ক্ষেত্র পাঁচটি:
 
১. আকিদা (ধর্মীয় বিশ্বাস)
২. ইবাদাত
৩. মু‘আমালাত (লেনদেন)
৪. মু‘আশারাত (আচরণ)
৫. আখলাক (চরিত্র)
 
উল্লিখিত প্রত্যেকটি বিষয়ের প্রতি সমান মনোযোগ দেওয়া জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে আখলাকের শিক্ষা দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে।’ এর মানে এই নয় যে, আকিদা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আকিদা ও আখলাক উভয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সচরাচর প্রথম দুটির প্রতি মনোযোগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করি। আর বাকি তিনটিকে একেবারেই অগ্রাহ্য করি। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের পদ্ধতি ছেড়ে দিয়ে অন্যদের পদ্ধতি গ্রহণ করছি। আসলে আমরা নিজেদের পদ্ধতি সম্পর্কে জানিই না।
 
মু‘আমালাত, মুয়া‘আশারাত এবং আখলাকের মূল বিষয়গুলো কুরআন, সুন্নাহ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সীরাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনীতে পাওয়া যায়। তাই সেই সর্বোত্তম প্রজন্মের কথা বেশি বেশি আলোচনা করাকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিতে হবে। নিজেরাও জানতে হবে, জানাতে হবে সন্তানদেরও। তাদের ঘটনাগুলো যেন আমাদের কাছে বাস্তব ও জাজ্বল্যমান অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং নাটক-সিনেমার তারকা নয়; সাহাবায়ে কেরামগণই আমাদের স্বতন্ত্র ও গৌরবময় পরিচয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সন্তানরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের নামের তুলনায় তথাকথিত এসব সেলিব্রিটিদের নামের সাথেই অধিক পরিচিত। আর কথাটা কেবল আমাদের সন্তানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়।
 
আসুন, একটি উদাহরণের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের জীবনী জানার উপকারিতা বোঝার চেষ্টা করি। আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার দিকে একটু তাকান। ক্ষমতাশীল লোকেরা এই শাসনব্যবস্থা থেকে নিজেদের মনের মতো ফায়দা লুটছে। এখন প্রশ্ন হলো, ইসলাম কি এমন কোনো পন্থা দেখিয়েছে, যেখানে এমন সুবিধাবাদের কোনো স্থান নেই? যার মাধ্যমে একজন ভালো শাসক নিযুক্ত পাওয়া সম্ভব?
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকে বিশ্লেষণ করে দেখলে এর উত্তর পাওয়া যাবে। কোন ভিত্তি ও মৌলিক শক্তি তাঁদেরকে সঠিক পথের উপর অটল রেখেছিল? আল্লাহর প্রতি তাকওয়া এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে—এই নিশ্চিত বিশ্বাস। এটাই তাদেরকে শয়তানের সকল ষড়যন্ত্র থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। তারাও তো মানুষ, তাদেরও ছিল নিজস্ব কামনা-বাসনা। ইসলামি ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে যে অনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তা-ও ছিল তাদের জানা। তাকওয়াই তাঁদেরকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কিছু করা থেকে বিরত রেখেছে। এটাই মূল চাবি। আর তারবিয়্যাহ হলো তাকওয়ার সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর উপায়।
 
© মির্জা ইয়াওয়ার বেইগ
['বিশ্বাসের পথে যাত্রা'—বই থেকে]
সিয়ান | বিশুদ্ধ জ্ঞান | বিশ্বমান