Thursday, April 3, 2025

দুয়া

গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সহজ দু'আর বাক্য শব্দে শব্দে অর্থসহ শিখুন—নামাজের সিজদায় পাঠ করার জন্য এগুলো দারুণ হবে ইনশাআল্লাহ্ (৪ নং পর্ব)
.
দু'আ তিনটির মাধ্যমে দুনিয়াতে অবিচ্ছিন্ন নিয়ামত, মানসিক প্রশান্তি এবং আখিরাতে স্বাচ্ছন্দময় জীবন—সবই অন্তর্ভুক্ত আছে, আলহামদুলিল্লাহ!
.
নবীজির প্রিয় সাহাবি আম্মার ইবনু ইয়াসার (রা.) নামাজে এসব বাক্য দিয়ে দু'আ করেছিলেন আর বলেছিলেন, এগুলো তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শিখেছেন। [নাসাঈ, হাদিস: ১৩০৪, সহিহ]
.
দু'আটি ছিলো অনেক অনেক লম্বা। সেখান থেকে আমরা সহজ তিনটি বাক্য তুলে ধরছি, যাতে সবাই শিখতে পারেন।
.
اللّٰهُمَّ أَسْأَلُكَ نَعِيْماً لَا يَنْفَدُ وَأَسْأَلُكَ الرِّضٰى بَعْدَ الْقَضَاءِ وَأَسْأَلُكَ بَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ
.
[মোটামুটি উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আসআলুকা না‘ঈমান লা ইয়ানফাদ, ওয়া আসআলুকার রিদ্বা বা‘অদাল ক্বাদ্বা, ওয়া আসআলুকা বারদাল ‘আইশি বা‘অদাল মাওত]
(আরবি ع ‘আইন’সহ বিভিন্ন হরফের উচ্চারণ বাংলায় লেখা যায় না। সুতরাং আমরা অনুরোধ করব—আপনারা আরবির সাথে মিলিয়ে পড়ুন। না হয়, নিশ্চিত ভুল শিখবেন)
.
[অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার কাছে এমন নিয়ামত (অনুগ্রহ) চাই, যা কখনো শেষ হবে না; তোমার কাছে চাই, যেন তোমার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারি এবং তোমার কাছে মৃত্যুর পর আরামদায়ক জীবন চাই]
.
এবার শব্দে শব্দে অর্থ মুখস্থ করুন—
.
اللّٰهُمَّ আল্লাহুম্মা [হে আল্লাহ] 
أَسْأَلُكَ আসআলুকা [আমি তোমার কাছে চাই]
نَعِيْماً না‘ঈমান [নিয়ামত বা অনুগ্রহ]
لَا يَنْفَدُ লা ইয়ানফাদ [শেষ হবে না]
وَأَسْأَلُكَ ওয়া আসআলুকা [তোমার কাছে চাই]
الرِّضٰى আর-রিদ্বা [সন্তুষ্টি/খুশি]
بَعْدَ বা‘অদা [পরে]
الْقَضَاءِ আল-ক্বাদ্বা [সিদ্ধান্ত]
وَأَسْأَلُكَ ওয়া আসআলুকা [তোমার কাছে চাই] 
بَرْدَ বারদা [শীতল (আরাম]
الْعَيْشِ আল-‘আইশ [জীবন]
بَعْدَ বা‘অদা [পরে]
الْمَوْتِ আল-মাওত [মৃত্যু]
.
এবার মুখস্থ করুন এভাবে—
.
اللّٰهُمَّ আল্লাহুম্মা [হে আল্লাহ]
.
أَسْأَلُكَ نَعِيْماً لَا يَنْفَدُ আসআলুকা না‘ঈমান লা ইয়ানফাদ
[তোমার কাছে এমন নিয়ামত (অনুগ্রহ) চাই, যা কখনো শেষ হবে না]
.
وَأَسْأَلُكَ الرِّضٰى بَعْدَ الْقَضَاءِ ওয়া আসআলুকার রিদ্বা বা‘অদাল ক্বাদ্বা
[তোমার কাছে চাই, যেন তোমার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারি]
.
وَأَسْأَلُكَ بَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ ওয়া আসআলুকা বারদাল ‘আইশি বা‘অদাল মাওত
[তোমার কাছে মৃত্যুর পর আরামদায়ক জীবন চাই]
.
কয়েকটি কথা:
--------------------
[এক.] প্রথম বাক্যটি দিয়ে দুনিয়ার সকল নিয়ামতই সম্পৃক্ত করা যায়। অন্তত দু'আর সময় মাথায় এমনটিই রাখবেন। 
.
[দুই.] আমরা বিভিন্ন খারাপ পরিস্থিতিতে পড়লে হতাশ হয়ে যাই; আল্লাহর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে পারি না। এমনটি করা খুবই খারাপ অভ্যাস। তাই এ থেকে মুক্তি পেতে আমরা দু'আ করব ‘তোমার কাছে চাই, যেন তোমার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারি'। আর, যে সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারে, তার চেয়ে সুখী মানুষ পৃথিবীতে নেই।
.
[তিন.] তৃতীয় বাক্যে মৃত্যুর পর আরামদায়ক জীবন চাওয়া হচ্ছে। এটা তো জরুরি। কারণ কেউ সর্বাধিক আনন্দে জীবন কাটাক অথবা সর্বাধিক দুঃখী জীবন কাটাক, তাদের প্রত্যেকের মৃত্যু আছে। আসলে মৃত্যুর পরের জীবনটাই মূল জীবন। তাই, সেই জীবনটা সুন্দর হওয়ার জন্যও এখানে দু'আ করা হচ্ছে। 
.
[চার.] ফেইসবুক লাইটে যের, যবর, পেশ বোঝা যায় না, অথচ আমরা এগুলো দিয়েছি।
.
[পাঁচ.] তাশদিদের উপরের হরকত যবর হয় এবং তাশদিদের নিচের হরকত যের হয় (যদিও তা হরফের উপরে হোক না কেন)
.
#আল্লাহর_নিরাপত্তায়
#মহান_রবের_আশ্রয়ে (৪ নং পর্ব)
আমাদের এই সিরিজ কমপক্ষে ২০ পর্ব হবে, ইনশাআল্লাহ্। পূর্বের তিন পর্বের লিংক কমেন্টে দেওয়া হলো।
.
#Tasbeeh

Wednesday, April 2, 2025

প্রশ্ন

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। 

আপনি নিম্নোক্ত তিনটি কাজের কোন একটি করুন।

১ - মাকে নিজের কাছে নিয়ে আসুন।
২ - স্ত্রী সহ নিজেই মায়ের কাছে চলে যান এবং যে কোন মূল্যে স্ত্রীর জন্য খাস পর্দার পরিবেশ নিশ্চিত করুন।
৩ - মায়ের জন্য বাড়ীতে ফুলটাইম বা পার্টটাইম খাদেমা/গৃহকর্মী রাখার ব্যাবস্থা করুন।

বাড়ীতে পর্দার পরিবেশ নিশ্চিত না করে স্ত্রীকে সেখানে রেখে আসা জায়েজ হবেনা। এক্ষেত্রে মায়ের অসন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনুরূপভাবে আপনি স্ত্রীকে দূরে রাখলে নিজে যদি গুনাহে জড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে তাহলেও স্ত্রীকে দূরে রাখা জায়েজ হবেনা। তাই ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নিন। মাকে ভালো রাখার ব্যাবস্থা করার পশাপাশি নিজের সংসার, সুখ, নিরাপত্তা ও দাম্পত্য সম্পর্কের ভবিষ্যত নিয়েও সতর্ক থাকুন। 

মনে রাখবেন, সাংসারিক বিষয়াবলীতে মা কিংবা স্ত্রী কারো অনুরোধই কখনো অন্ধভাবে মানা যাবেনা। বরং ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে যেটা শরীয়ত, সামাজিকতা, সাধারণ যুক্তিবোধ ও ভবিষ্যত ফলাফলের বিবেচনায় সকলের জন্য অধিক উপযুক্ত ও উপকারী মনে হবে সেটাই করবেন এবং বাকিদের সামনে আপনার পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন। তবে ক্ষতি ও অসহনীয় কষ্ট না হলে তখন নিজের চিন্তা ও উপলব্ধির উপরে মায়ের আবদারকে প্রাধান্য দিতে চেষ্টা করবেন। কখনো কখনো স্ত্রীর ক্ষেত্রেও এমনটা করবেন। আল্লাহ আপনাদেরকে সুখী করুন।



।।।
গ্রুপে সার্চ করে পাই নি। এপ্রুভ প্লিজ
স্পর্শকাতর প্রশ্ন:

চাকুরির সুবাধে বাড়ি থেকে দূরে থাকি। বাড়িতে মা অসুস্থ, চলা ফেরায় কষ্ট হয়। স্ত্রীকে নিয়ে আমি চাকুরি স্থলের কাছাকাছি থাকি। কিন্তু, মা সেটা পছন্দ করছেন না; সে চায় স্ত্রীকে তার কাছে রেখে যাই। স্ত্রী আমার সাথে থাকতে চায়, তাছাড়া বাড়িতে পর্দা রক্ষা করাটাও বেশ কঠিন আমার স্ত্রীর জন্য। স্ত্রী আমার সাথে থাকলে আমার জন্যও সুবিধা। 

কিন্তু, স্ত্রীকে মায়ের কাছে রাখছি না বলে তিনি আমার প্রতি ক্রোধান্বিত। আমি তাকে কষ্ট দিচ্ছি বলেও নানানভাবে বদ দোয়া দিতে থাকেন। আমি প্রতি মাসে প্রায় সময়ই বাড়িতে যাই। 

কিন্তু, তার কথা হল স্ত্রীকে যেন তার কাছে রেখে যাই, রান্না বান্না যেন করতে পারে। 

এমন পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত?



উত্তর দিয়েছেন 
মুফতি আফফান বিন শরফুদ্দিন (হাফি.)

Tuesday, April 1, 2025

১৭ শ্রেনীর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না

যে ১৭ শ্রেনীর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না -

১। হারাম খাদ্য ভক্ষণকারী জান্নাতে যাবে না। (সুনানে বাইহাকী, হাদীস নং ৫৫২০)

২। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছি'ন্নকারী জান্নাতে যাবে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৫২৫)

৩। প্রতিবেশীকে ক'ষ্ট দানকারী জান্নাতে যাবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৬)

৪। মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, দাইউস ও পুরুষের বেশ ধারণকারীণী জান্নাতে যাবে না। (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ২২৬)

৫। অশ্লীলভাষী ও উগ্রমেজাজী জান্নাতে যাবে না। (আবু দাউদ, হাদীস নং ৪১৬৮)

৬। অধীনস্থদেরকে ধোঁ'কাদানকারী শাসক জান্নাতে যাবে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬১৮)

৭। অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারী জান্নাতে যাবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৬)

৮। খোটাদানকারী, অবাধ্য সন্তান ও মদ্যপ জান্নাতে যাবে না। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ৫৫৭৭)

৯। চোগলখোর জান্নাতে যাবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫১)

১০। অন্য পিতাকে যে নিজের পিতা বলে পরিচয় দেয় সে জান্নাতে যাবে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬২৬৯)

১১। গর্বকারী-অহংকারকারী জান্নাতে যাবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩১)

১২। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাফরমান জান্নাতে যাবে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৭৩৭)

১৩। দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে ইলম অর্জনকারী জান্নাতে যাবে না। (আবু দাউদ, হাদীস নং ৩১৭৯)

১৪। অকারণে তালাক কামনাকারীণী জান্নাতে যাবে না। (জামি‘ তিরমিযী, হাদীস নং ১১০৮)

১৫। মাথার চুলে কালো কলপ ব্যবহারকারী জান্নাতে যাবে না। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ৪৯৮৮)

১৬। রিয়াকারী জান্নাতে যাবে না (যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য কিছু করে)। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫২৭)

১৭। ওয়ারিসকে বঞ্চিতকারী জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৬৯৪)
Courtesy - Zikrillah




Monday, March 31, 2025

বাচ্চাদের ঈদ-সালামীর বিধান


বাচ্চাদের ঈদ-সালামীর বিধান:

দুই ঈদ বা বছরের বিভিন্ন সময়ে শিশুদেরকে নগদ টাকা-পয়সা হাদিয়া দেয়া হয়। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়ের স্বাভাবিক রীতি হলো তারা এসব টাকা নিজেরা নিয়ে নেন, এবং সংসারের বিভিন্ন কাজে খরচ করেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পরিবারে যদি আর্থিক সমস্যা বেশি না হয় তাহলে শিশু সন্তানের টাকা-পয়সা খরচ করা উচিত নয়, বরং তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে সেগুলো খরচ করা উচিত। এবং সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা উচিত। তবে বাবা-মা যদি এই হিসেবে সেগুলো খরচ করেন যে, সবসময় সন্তানের জন্য যেসব খরচ করা হয় এর বিনিময়ে এসব টাকা তারা নিবেন, তাহলে এর অনুমতি রয়েছে। মোটকথা, এক্ষেত্রেও পূর্বের বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে।

আর পিতা যদি আর্থিক অস্বচ্ছলতার দরুন সেগুলো ব্যবহার বা খরচ করতে চায় তাহলে তার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নেয়া জায়েজ আছে। তবে প্রয়োজন না হলে বা প্রয়োজন অতিরিক্ত না নেয়াই ভালো। কেননা এসব উপহারের প্রতি শিশুদের মন লেগে থাকে। হাদীসের মধ্যে এরশাদ হয়েছে, 
جاءَ رجلٌ إلى النَّبيِّ صلَّى اللَّهُ عليْهِ وسلَّمَ فقالَ إنَّ أبي اجتاحَ مالي فقالَ أنتَ ومالُكَ لأبيكَ وقالَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليْهِ وسلَّمَ إنَّ أولادَكم من أطيبِ كسبِكُم فَكلوا من أموالِهم
“এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার সম্পদ ও সন্তান আছে। আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। তিনি বললেন, “তুমি ও তোমার সম্পদ উভয়ই তোমার পিতার। তোমাদের সন্তান তোমাদের জন্য সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমরা তোমাদের সন্তানের উপার্জন থেকে খাও।” [আবু দাউদ হা/৩৫৩০; ইবনে মাজাহ, হা/২২৯২, সনদ সহিহ]

এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, সন্তান যদি টাকা-পয়সা অপচয় করার বা খারাপ কাজে খরচ করার কোনো আশঙ্কা থাকে, তাহলে বাবা-মায়ের উচিত হবে সন্তানের হাতে প্রয়োজনাতিরিক্ত টাকা না দেয়া, বরং এসব টাকা তারা নিজেরাই সন্তানের বিভিন্ন প্রয়োজনে খরচ করা।

বাচ্চাদের টাকা-পয়সা ও গিফট নিয়ে বিস্তারিত  

বাচ্চাদের উপহারসামগ্রী ও টাকা-পয়সা, ঈদ সালামী ইত্যাদি খরচের বিধান : 

শিশুরা যে-সমস্ত উপহারসামগ্রী ও টাকা-পয়সা পায় এর বিধান আমরা কয়েকটি সূরতে জানতে পারি :

১. যদি এমন কিছু উপহার দেয়া হয় যা সাধারণত শিশুদের জন্যই ব্যবহার করা হয় বা শিশুদের জন্যই উপযুক্ত, যেমন ধরুন প্যাম্পাসের বড় প্যাকেট দেয়া হলো, অথবা ফর্মুলা দুধ দেয়া হলো, অথবা শিশুর পরিধেয় পোশাক দেয়া হলো। এসব জিনিস শিশুদের ব্যবহারের জন্যই। তো স্বাভাবিক ভাবেই এসব জিনিসের মালিক ওই শিশুই হবে। আর এগুলো অন্য কেউ ব্যবহারও করবে না। 

তবে তা যদি প্রয়োজনাতিরিক্ত হয়, যেমন শিশুর প্যাম্পাসের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে, অথবা শিশুটি এখন শক্ত খাবার খাচ্ছে, ফর্মুলা দুধের প্রয়োজন নেই, অথবা যে পোশাক দেয়া হয়েছে তা ছোট হচ্ছে, কিংবা শীতের পোশাক দেয়া হয়েছে, কিন্তু এখন গরম, তাই এখন এর প্রয়োজন নেই। অথবা বাচ্চার যথেষ্ট কাপড় রয়েছে, যা দেয়া হয়েছে তা শিশুর প্রয়োজনাতিরিক্ত। তাহলে এ সমস্ত উপহার এ নিয়তে অন্য শিশুকে দেয়া যাবে, পরবর্তীতে সমমূল্যের কোনো বস্তু শিশুকে দিয়ে দেয়া হবে। এর সহজ পদ্ধতি হলো, শিশুকে যখন কোনোকিছু দেয়া হয় তখন এই নিয়ত থাকলেই হবে, পূর্বে শিশুর কোনো সম্পদ খরচ করে থাকলে এখন তা শোধ করে দিচ্ছি।
 
প্রত্যেক বাবা-মায়ের ভেতরেই এমন দায়িত্ববোধ থাকা চাই। সন্তানের সম্পদ মানেই আমার সম্পদ তা নয়। সাবালক হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশু যে জিনিসের মালিক হয় এর মধ্যে অন্য কারও কতৃত্ব চলে না। এমনকি শিশু খরচ বা ব্যবহার করার অনুমতি দিলেও এই অনুমতি গ্রহণযোগ্য না। শিশুর আপন ছোট ভাই-বোন হলেও একই হুকুম বহাল থাকবে।

তবে উপহারসামগ্রী যদি খাবার হয়, এবং তা যদি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে, অথবা ওই খাবার যদি শিশুটির জন্য ক্ষতিকর হয় কিন্তু অন্য শিশুর জন্য উপকারী হয় তাহলে অন্য কাউকে তা দেয়া যাবে, এবং পরবর্তীতে সমমূল্যের কোনো খাবার দেয়ার সময় এই নিয়ত থাকলেই হবে যে, এটা পূর্বের ওই খাবার বিনিময়ে দেয়া হলো।

এখানে বাবা-মায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, তারা এই সুযোগে সন্তানকে এভাবে শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে পারেন, সন্তান যেন কোনো খাবার একাকী না খায়, বরং তা সমবয়সি কাউকে সাথে নিয়ে খায়, অথবা সন্তান যেন অপচয় থেকে দূরে থাকে। এজন্য ছোট থেকেই তাকে এ শিক্ষা দেয়া যে, যে জিনিস তার প্রয়োজন নেই সেটা যেন সে দান করে দেয়। কিন্তু পূর্বে যেমন বলা হয়েছে যে, সাবালক হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুর কর্তৃত্ব গ্রহণযোগ্য নয় তাই পরবর্তীতে শিশুকে এর সমপরিমাণ কোনো জিনিস দিয়ে দিতে হবে। 

এখানেও শিশুর তারবিয়তের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ রয়েছে, তা হলো, শিশুকে এটা শেখানো যে, অনুমতি ছাড়া কারও জিনিস ব্যবহার করা যাবে না। যদি কেউ করেও ফেলে তাহলে পরবর্তীতে তা আদায় করতে হবে।

তাই মাঝে মাঝে শিশুকে কিছু দেয়ার সময় এটা বলে দেয়াও উত্তম, তোমার কাছ থেকে কিছুদিন আগে যে ওই খাবারটা খেয়েছিলাম, এর বিনিময়ে তোমাকে এখন এটা দিলাম। এতে সন্তান শিখবে, যেকোনো খাবার একা খাওয়ার চেয়ে কাউকে সাথে নিয়ে খাওয়া ভালো, অথবা এই খাবারের প্রতি আমার চেয়ে যে বেশি মুখাপেক্ষী তাকে নিয়ে খেতে হয়।

কারও একাধিক সন্তান থাকলে এক সন্তানের পোশাক পরবর্তীতে অন্য সন্তান পরে এটা স্বাভাবিক। তবে এ ক্ষেত্রেও পরবর্তীতে সমমূল্যের কোনোকিছু দিয়ে দিতে হবে।

২. যদি শিশুকে এমন কিছু উপহার দেয়া হয় যা শিশুদের উপযুক্ত না। তাহলে উরফ (সামাজিক রীতি) দেখতে হবে। সামাজিক রীতি হিসেবে যদি এসব জিনিস বাবা-মাকেই দেয়া উদ্দেশ্য হয় তাহলে বাবা-মা এসব জিনিসের মালিক হবে। যেমন শিশুর আকিকার সময় ঘরোয়া কোনো আসবাব উপহার দেয়া হলো।

 আমাদের দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে বেশিরভাগ সময় ডিনারসেট, ঘড়ি, বা ঘরোয়া বিভিন্ন আসবাব উপহার দেয়া হয়। এসব জিনিস মূলত শিশুর জন্য দেয়া হয় না, বরং ঘরে ব্যবহারের জন্যই দেয়া হয়। আর এসব উপহার যদি শিশুর বাবার বংশের কেউ দিয়ে থাকে তাহলে বাবা এসবের মালিক হবে, আর যদি মায়ের বংশের কেউ দিয়ে থাকে তাহলে মা এসবের মালিক হবে। এবং মালিক ইচ্ছেনুযায়ী এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

৩. কোথাও যদি সামজিক রীতি অনুযায়ী এসব জিনিস শিশুকেই দেয়া উদ্দেশ্য হয় তাহলে এসবের মালিক ওই শিশুই হবে। এবং প্রথম সূরতে বর্ণিত সকল বিধান এখানেও কার্যকর হবে।

৪. কেউ যদি উপহার দেয়ার সময় স্পষ্ট উল্লেখ করে দেয় যে, এটা শিশুর বাবাকে বা মাকে দেয়া হলো, তাহলে যাকে দেয়া হয়েছে সেই এর মালিক হবে, এবং এতে হস্তক্ষেপের পূর্ণ অধিকার তারই থাকবে।

৫. দুই ঈদ বা বছরের বিভিন্ন সময়ে শিশুদেরকে নগদ টাকা-পয়সা হাদিয়া দেয়া হয়। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়ের স্বাভাবিক রীতি হলো তারা এসব টাকা নিজেরা নিয়ে নেন, এবং সংসারের বিভিন্ন কাজে খরচ করেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পরিবারে যদি আর্থিক সমস্যা বেশি না হয় তাহলে শিশু সন্তানের টাকা-পয়সা খরচ করা উচিত নয়, বরং তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে সেগুলো খরচ করা উচিত। এবং সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা উচিত। তবে বাবা-মা যদি এই হিসেবে সেগুলো খরচ করেন যে, সবসময় সন্তানের জন্য যেসব খরচ করা হয় এর বিনিময়ে এসব টাকা তারা নিবেন, তাহলে এর অনুমতি রয়েছে। মোটকথা, এক্ষেত্রেও পূর্বের বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে।

আর পিতা যদি আর্থিক অস্বচ্ছলতার দরুন সেগুলো ব্যবহার বা খরচ করতে চায় তাহলে তার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নেয়া জায়েজ আছে। তবে প্রয়োজন না হলে বা প্রয়োজন অতিরিক্ত না নেয়াই ভালো। কেননা এসব উপহারের প্রতি শিশুদের মন লেগে থাকে। হাদীসের মধ্যে এরশাদ হয়েছে, 
جاءَ رجلٌ إلى النَّبيِّ صلَّى اللَّهُ عليْهِ وسلَّمَ فقالَ إنَّ أبي اجتاحَ مالي فقالَ أنتَ ومالُكَ لأبيكَ وقالَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليْهِ وسلَّمَ إنَّ أولادَكم من أطيبِ كسبِكُم فَكلوا من أموالِهم
“এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার সম্পদ ও সন্তান আছে। আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। তিনি বললেন, “তুমি ও তোমার সম্পদ উভয়ই তোমার পিতার। তোমাদের সন্তান তোমাদের জন্য সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমরা তোমাদের সন্তানের উপার্জন থেকে খাও।” [আবু দাউদ হা/৩৫৩০; ইবনে মাজাহ, হা/২২৯২, সনদ সহিহ]

এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, সন্তান যদি টাকা-পয়সা অপচয় করার বা খারাপ কাজে খরচ করার কোনো আশঙ্কা থাকে, তাহলে বাবা-মায়ের উচিত হবে সন্তানের হাতে প্রয়োজনাতিরিক্ত টাকা না দেয়া, বরং এসব টাকা তারা নিজেরাই সন্তানের বিভিন্ন প্রয়োজনে খরচ করা।

সূত্র : 
১. আবু দাউদ হা/৩৫৩০
২. ইবনে মাজাহ, হা/২২৯২
৩. ফাতাওয়া শামী, ৫/৬৮৭,
৪. ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৪/৩৭৪
৫. বাহরুর রায়িক, ৭/২৮৪
৬. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ২৫/৪৯৪
৭. জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন করাচির ইফতা বিভাগ থেকে প্রদত্ত ফতওয়াকে সামনে রেখে আমাদের দেশ ও বর্তমান অবস্থানুযায়ী লেখায় কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে।

Tanjil Arefin Adnan (Hafiz.)